মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০১৭

Mackley and Education in British-India

মেকলে ও বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্*
বৃটিশরা দু‘শ বছর ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছে। তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে এতদাঞ্চলে অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছে। তাদের রেখে যাওয়া অনেক কিছুর জের আমরা এখনও বহন করে যাচ্ছি। কিন্তু তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের জন্য ভাল কাজ করে গেছে। এরমধ্যে প্রশাসন, আইন পরিষদ, বিচার ব্যবস্থা, আইন-কানুন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকতার রূপদান অন্যতম। ভারত উপমহাদেশভুক্ত দেশগুলোতে তাদের প্রতিষ্ঠিত ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব আমরা বর্তমানেও দেখতে পাই। বৃটিশ শাসনামলে তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এখানে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে কমিশন গঠন, শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে গেছে, তারা। এ নিবন্ধে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ও মেকলে কমিশনের আলোকে একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হবে।
বৃটিশ-ভারতের শিক্ষার পটভূমি:
১৭৫৭ সালে বৃটিশরা ভারত উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। তাদের অনুগত একদল শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি করার প্রয়াস চালায় তারা। গভর্ণর ওয়ারেন হেস্টিংস ১৮১৩ সালে চার্টার এক্ট অনুযায়ি ১৭৮১ সালে মুসলমানদের অনুরোধে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোনস এশিয়াটিক সোসাইটি গড়ে তুলেন। প্রাচ্যবিদ ও ফার্সি ভাষার পন্ডিত উইলিয়াম উইলকিন্স, হোরেইস হ্যাম্যান উইলসন, নাথানিয়াল হেলহেড প্রমুখ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় জোনসের সহযোগি ছিলেন। ১৭৭৮ সালে চার্লস উইলকিন্স বাংলা ভাষায় টাইপ রাইটার উদ্ভাবন করেন। প্রথম বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন হেলহেড। আর ১৭৯২ সালে জনাথন ডানকান বেনারসে সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করেন। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেনলি বৃটিশ কোম্পানীর কর্মচারিদেরকে ভাষাগতভাবে সচেতন করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৩ সালে চার্টার আইন পাশ করে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে এক লক্ষ রোপী বা টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ১৮২৪ সালে জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্স্ট্রাকশনস গঠন করা হয়। এরমধ্যে ১৮২৪ সালে লর্ড এ্যামহেস্ট কলকাতায় প্রাচ্য শিক্ষার প্রসারকল্পে ‘সংস্কৃত কলেজ’ স্থাপন করেন। রাজা রামমোহন রায় এ ব্যবস্থার বিরোধীতা করেন। বৃটিশ শাসক লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক বিশ্বাস করতেন, উপরের স্তর হতে শিক্ষা নিন্ম স্তরের দিকে প্রসারিত হবে। এতে সরকারের তহবিল কম প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি পাশ্চাত্য শিক্ষা সম্প্রসারিত হবে। এরমধ্যে বৃটিশ ইতিহাসবিদ স্যার টমাস বেবিংটন মেকলে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর পরামর্শে। ১৮৩৮ সালে মেকলে প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতির আলোকে শিক্ষার সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। অত:পর ১৮৩৫ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর উদ্যোগে কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং একই বছর (১৮৩৫) দ্যা এ্যালফিনস্টোন ইন্সস্টিটিউট অব মোম্বে প্রতিষ্ঠা করা হয়। লর্ড হার্ডিং ১৮৪৪ সালে ঘোষণা দেন যে, ইংরেজি জানা ভারতীয়রা সরকারি চাকুরিতে সুযোগ পাবে। ফলে, ভারতীয়রা ইংরেজি ভাষা শিখণের প্রতি উৎসাহিত হয়ে ওঠে। ১৮৫৪ সালে বৃটিশ-ভারতে স্যার চার্লস উড শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্ব নিন্মস্তর এবং উচ্চ স্তরের মধ্যে সমন্বয় করার প্রস্তাব দেন। এটা চার্লস ডেচপাস নামে অভিহিত। আর ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে এটা ‘মেঘনা কার্টা’ নামে পরিচিত। চার্লসের শিক্ষা সংস্কার সুপারিশমালার প্রধান দিকগুলো ছিল নিন্মরূপ;
১. ভারত উপমহাদেশে পৃথক একটি শিক্ষা বোর্ড গঠন করতে হবে।
২. কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।
৩. শিক্ষক এবং শিক্ষাদানের উপযোগি পরিবেশ নিশ্চিতকরণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. সরকারি স্কুল এবং কলেজগুলোকে সংস্কার করতে বলা হয়, এতে।
৫. মধ্যস্তরের জন্য নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করা হয়।
৬. বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদান প্রদানের ব্যবস্থাকরণ।
৭. গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও উন্নয়ন।
৮. নারী শিক্ষা, গণ শিক্ষা, আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসার এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৯. সরকারি স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধিকরণ, পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যবস্থাকরণ, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

চার্লস উড-এর সুপারিশ অনুযায়ি বৃটিশ সরকার; কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল। ১৮৫৫ সালে সরকারি স্কুল পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এর অধীনে ৭৯টি ইংলিশ স্কুল এবং ১৪০টি সরকারি অনুদাপ্রাপ্ত নেটিভ স্কুল ছিল। চার্লস উড ভারতে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সুপারিশ অনুসারে ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৮২ সালে লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৮৮২ সালে স্যার উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে বৃটিশ শাসক লর্ড রিপনের শাসনামলে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ১৮৮৪ সালে নিন্মোক্ত সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন।
-স্কুল এবং কলেজগুলোতে সরকারি অর্থ প্রদান করা হবে।
- স্কুল এবং কলেজের উপর থেকে সকল প্রকার নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়া হবে।
-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হবে স্থানীয় সরকার এবং জেলা পরিষদের অধীনে।
-উচ্চ শিক্ষার উপর বিশেস জোর দেয়া হবে।
১৯০২ সালে স্যার থমাস রেলফের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্ষেত্রের অধিকতর সংস্কারের লক্ষ্যে রেলফ কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ইন্ডিয়ান ইউনির্ভাসিটি কমিশন নামেও পরিচিত। স্যার গুরুদাস ব্যানার্জী এবং ষেয়দ হোসাইন বিলগ্রামী এ কমিশনে ভারতীয় সদস্য ছিলেন। ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়। এ আইন অনুযায়ি ১৯১৭ সালেিএকটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। স্যার মাইকেল স্যাডলার ছিলেন এ কমিশনের উপদেষ্টা। এটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন নামেও খ্যাত।
মেকলে ও ভারতে আধুনিক শিক্ষার বিকাশ:
ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তিনটি সংগঠন মূর ভূমিকা পালন করে। ক্রিস্টান মিশনারি, বৃটিশ সরকার এবং বৃটিশ সরকারের প্রিগতিশীল আইন ব্যবস্থা। খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টীয় ধর্ম ও আদর্শ প্রচার এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য পুরো ভারত উপমহাদেশ জুড়ে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তাদের প্রতিষ্ঠিত এসব স্কুলে আধুনিক ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতির পাশাপাশি ক্রিস্টান ধর্মীয় শিক্ষাও বিস্তার লাভ করে। ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানোতে বৃটিশ সরকারে প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও জনপ্রশাসন এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। তারা মনে করেছিল যে, বৃটিশ সংস্কৃতির প্রসার বিশ্ব ব্যবস্থায় সামাচিক ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। আধুনিক শিক্ষা আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার দার উন্মোচিত করে দিয়েছিল। এতে ধার্মিকতার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছিল। তাছাড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রের প্রসার ঘেটিয়েছিল। পরে প্রকাশনা শিল্প কারখানা গড়ে এবং ছাপা বইপত্র ব্যাপকভাবে সারা ভারত উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। এতে ধর্মগ্রন্থসমূহও সাধারণ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে যায়। শিক্ষায় আধুনিকতার প্রচলন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য সকল বিষয় পড়া, অধ্যয়ন করা এবং চর্চা করার অবাধ সুযোগ-সুবিধা অবারিত করে দেয়। এভাবে ভারতে এবং উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে।
মেকলে এবং ভারত উপমহাদেশে শিক্ষার প্রসার: স্যার টমাস জোন্স বেবিংলী মেকলে ছিলেন বৃটিশ ইতিহাবিদ এবং রাজনীতিক। তিনি প্রচুর লেখালেখি করেনে এবং প্রবন্ধকার হিসেবে সুপরিচিত। তিনি ১৮৩৫ সালে প্রকাশিত মেকলে মাইনিউটস নামক ভারতের শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনার মাধ্যমে ভারতে ইংরেজি ভাষা শিখণ এবং পাশ্চত্য সংস্কৃতির বিকাশে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন। তিনি সরকারি দফতরগুলোতে ফার্সি ভাষার স্থলে ইংরেজি, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় শিখণ-শেকানো এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শি শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে মুখ্য অবদান রাখেন। তার শিক্ষা ভাবনা মেকলেবাদ নামেও খ্যাত। তাঁর মতে মেকলে পৃথিবীকে সভ্য জাতি এবং বর্বর জাতি এ দুভাগে ভাগ করেছিলেন। তিনি মাইনিউটসে মন্তব্য করেন যে সারা ভারতের সংস্কৃতি ভাষার রচনাবলি সংগ্রহ করে একত্রিত করা হলে, তা বৃটেনের প্রাথমিক স্তরে চর্চা করা জ্ঞানের চেয়ে কম মূল্য বহন করে। মেকলে ছিলেন উদার এবং মুক্ত শিক্ষা দর্শনে বিশ্বাসী। মেকলে ১৮০০ সালে বৃটেনের স্কটল্যান্ডে এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হার্টফোর্ডশায়ার-এর একটি বেসরকারি স্কুলে এবং কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনা করেন। বেমব্রিজে পড়াশোনা করার সময় তিনি কবিতা লিখতেন এবং এজন্য পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টার হলেও, তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল আইন পেশার চেয়ে রাজনৈতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রতি। মেকলে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতেন। তিনি ভাল বক্তা ছিলেন। ১৮৩২ সালে তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হন। ১৮৩২ সাল হতে ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত বৃটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ১৯৩৪ সালে ভারত আসেন এবং ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশ-ভারত সরকারের শীর্ষ পদে ছিলেন। ১৮৩৫ সালে তিনি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার প্রচলন এবং বিকাশ ঘটানোর জন্য বিখ্যাত মাইনিউটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। সেসময় ভারতে সংস্কৃত বা ফার্সি ভাষায় শিক।ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করানো হত। মেকলে যক্তি প্রদর্শন করেন যে, ভারতে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়া চলবে না, তাদেরকে কয়েকটি বিদেশী ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষার্থীরা বেশি কিছু শিখতে পারে না, তাদেরকে ইংরেজি ভাষায় শিখণ-শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে বলে, তিনি মতামত দেন। মেকলে আরও মন্তব্য করেন যে সংস্কৃতি বা আরবী ভাষায় কবিতা বেশি লেখা হয়েছে বটে, কিন্তু ইউরোপীয় সাহিত্য এ দুভাষার সাহিত্যের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং ব্যাপক। অতএব ভারতীয়দেরকে ইউরোপীয় শিক্ষা, দর্শন, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করে তুলতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন ইংরেজি ভাষা শিক্ষা এবং এর প্রসার ঘটানো। তিনি ষষ্ট শ্রেণি হতে পরের শিক্ষা স্তরগুলোতে শিখণ-শেখানোর মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করে দেয়ার প্রস্তাব করেন। এতে ইংরেজ ঘেসা ভারতীয় একদল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থেরি হবে এবং তার বৃটিশ ও ভারতীয়দের মাঝে সাংস্কৃতিক দুতিয়ালির ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।এটা দৃশ্যত অসম্ভব মনে হলেও, বৃটিশ শাসন ব্যবস্থার স্বার্থে তা করতেই হবে। শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি ভারতীয় প্যানেল কোড প্রচলনেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর মেকরৈ প্রস্তাবিত প্যানেল কোড আইনে পরিণত করা হয়। অতপর ১৮৭২ সালে ভারতে ফৌজদারি দন্ডবিধি আইনও কার্যকর করা হয়। আর ১৯০৯ সালে দেওয়ানী দন্ডবিধি কার্যকর করা হয়। ক্রমান্বয়ে বৃটিশ-ভারতের আইন-কানুন, বিধি-বিধান, রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতিসহ অনেক বিষয়ে মেকলে অবদান রাখেন। বিশেষত; শিক্ষার আধুনিকায়নে মেকলে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রণীত রূপরেখা অনুসারে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় চার্লস উডসহ অন্যান্য শিক্ষাবিদগণ বিভিন্ন কমিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর নিজ নিজ দেশের সরকার তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষার্থীদের মেধা-মননসহ সকল দিক বিবেচনায় বৃটিশ শাসন ও ঐতিহ্যের ধারায় বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পেরিচালিত হয়ে আসছে।
রাজনীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মেকলে:
বৃটিশ জাতি রাজনীতি, কূটনীতি, সমরনীতি, রাজ্য দখল ও শাসন বিস্তারের ক্ষেত্রে এক সময় একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। পাশাপাশি, বুদ্ধিবৃত্তির জগত, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, দর্শনসহ সকল ক্ষেত্রে মানব সভ্যতার বিকাশে তাদের অবদান রয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার শেক্শপিয়ার, কবি ও দার্শনিক জন মিল্টন, রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আধুনিক কবি টি.এস এলিয়টসহ অনেক বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানীর জন্মধাত্রী হলো বৃটিশরা। তাছাড়া, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ডসহ প্রাচীন বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বৃটেনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালিন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টাইন চার্চিল নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। মেকলেও বৃটিশ জাতির সৃষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ১৮৩৮ সালে তিনি বৃটেনে ফিরে যান এবং সেদেশে এম.পি। সেখানকার অনেক কিছুতে স্যার টমাস জোন্স বেবিংলি মেকলের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৮৬০ সালে তিনি পরলোক গমন করেন।
উপসংহার: বৃটিশরা এ উপমহাদেশে এসেছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য। তারা ব্যবসায়ির বেশে এসে এখানে দু‘শ বছর শাসন-শোষণ করে গেছে। উলট-পালট করে গেছে; ভারত উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, সমরনীতি, কূটনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি; সবকিছু। কিন্তু তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আইনের জগতকে একটি আধুনিক ভিত্তি দিয়েছে। বিশেষত: ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য শিখণ-শেখানো এবং অনুশীলণ কার্যক্রমের ব্যাপক বিস্তার ও প্রসারতা ণেলাভের কার ভারত উপমাহদেশীয় জাতি এবং দেশগুলো অনেক উপকৃত হয়েছে। বিশ্ব দরবারে এখানকার মানুষদের বিচরণের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে, তারা। স্যার টমাস জোন্স বেবিংলি মেকলে, চার্লস উড, হান্টিংস, সেটলার প্রমুখ বৃটিশ শিক্ষাবিদ; এতদাঞ্চলের  শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন।
*সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার; মহেশখালী, কক্সবাজার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন