মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০১৭

Syed Naquib Al-Attas: Malaysian Philosopher

সৈয়দ নকীব আল-আত্তাস: মালয়েশিয়ান
বর্ষিয়ান মুসলিম দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্*
সৈয়দ মোহাম্মদ আল-নকীব বিন আলী আল-আত্তাস বিশ্ব মাপের একজন মুসলিম দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ইসলামীক সকল বিষয় তাঁর স্মৃতিতে যেন জ্বল জ্বল করে, পুরোপুরি। একইভাবে পৃথিবীর যাবতীয় জটিল-কঠিন সকল ধর্মতত্ত্ব, শিক্ষা, দর্শন, মেটাফিজিক্স (অধিবিদ্যা), ইতিহাস এবং সাহিত্য বিষয়েও সৈয়দ আল-আত্তাস সমান পারদর্শি। তিনি জ্ঞানের ইসলামায়নের বিপক্ষে। তাঁর দর্শন ও শিক্ষা পদ্ধতির একটিই লক্ষ্য; “মন, দেহ ও আত্নার ইসলামায়ন এবং এর প্রভাব প্রতিফলিত হবে আধ্যাত্নিক এবং প্রকৃতিসহ মুলমান ও অন্য ধর্বালবলম্বীদের ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায়। সৈয়দ আল-আত্তাস তাঁর ভাবনা-দর্শন প্রকাশে ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। ইসলামী চিন্তা-ধারা এবং সভ্যতা; বিশেষত: সুফিবাদ, মহাকাশ বিদ্যা,  জ্যোতির্বিদ্যা, অধিবিদ্যা, দর্শন এবং মালে ভাষা ও সাহিত্য; প্রভৃতি বিষয় তাঁর রচনাবলিতে আলোকপাত করা হয়েছে। এ নিবন্ধে আমরা আল-আত্তাসের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরার প্রয়াস চালাব।
শৈশব এবং শিক্ষা গ্রহণ:
সৈয়দ মোহাম্মদ নকীব আল-আত্তাস জাভার বোগর শহরে ঐতিহাসিক দরবেশ ও সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বসূরিগণ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ:)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের বংশধর। মা-বাবার তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর বড় ভাই সৈয়দ হোসেইন আল-আত্তাস দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও রাজনীতি করেন। তিনি শিক্ষাবিদ টুংকু আব্দুর রহমানের নিকটাত্নীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে জোহর শহরে মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করেন, তিনি। তিনি মালয় সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম এবং ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে আল-আত্তাস মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে মালয় সেনাবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৫৩ সাল হতে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের চেস্টার এটন হলে এবং পরে রয়েল মিলিটারি একাডেমীতে সামরিক বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। ইংল্যান্ডে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে তিনি আধুনিক পাশ্চত্য সভ্যতার সাথে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। তিনি প্রশিক্ষণ একাডেমীর গ্রন্থাগারে সুফিধারার ভাবনা-চিন্তা; বিশেষত: আল্লামা জামি সম্পর্কে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। তিনি স্পেন হতে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত ব্যাপক দেশ সফর করেন, সেখানকার ইসলামী ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। গভীর ও ব্যাপক পরিসরে অধ্যয়ন এবং পড়াশোনা চর্চারে জন্য আল-আত্তাস সেনা অফিসারের চাকুরি হতে পদত্যাগ করেন। চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি সিঙ্গাপুরের মালয় ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ১৯৫৭ সাল হতে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করা কালে সাহিত্য বিষয়ে এবং সুফিবাদ চর্চা বিষয়ে তিনি দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। এসময় আল-আত্তাস কানাডার মন্ট্রিলস্থ ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে তিন বছর পড়াশোনা করার জন্য বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। সে বিশ্ববিদ্যালয় হতে তিনি, ১৯৬২ সালে ইসলামী দর্শন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নম্বর পেয়ে এম.এ পাশ করেন। আল-আত্তাস ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ.জে আর্বেরীর অধীনে ‘স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডি’জে অধ্যয়ন করতে যান। এখানে তিনি হামজা ফন্সুরির মরমীবাদের উপর তিনি ডক্টোরাল থিসিস রচনা করেন দুই খন্ডে। মালয়েশিয়ায় ফিরে এসে তিনি কুয়ালালামপুরস্থ ‘ইউনির্ভাসিটি অব মালেশিয়ায়’ মালয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। অন্য শিক্ষকদের সাথে পরার্শক্রমে তিনি তাঁর বিভাগের পাঠ্যসূচিসহ  সকল শিক্ষাকার্যক্রমকে ঢেলে সাজান। অত:পর আল-আত্তাস ‘ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি অব মালেশিয়া’তে মালয় ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ের বিভাগীয় প্রধান পদে যোগদান করেন। তিনি মালয় ভাষাকে উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রচলনের জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করেন। আর মালয় ভাষা ও সাহিত্যকে উন্নত এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৭ সালে আল-আত্তাস কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইস্টিটিউট অব ইসলামিক থট এন্ড সিভিলাইজেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল বিভাগে ও ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে ইসলামী সভ্যতার ব্যাপারে ব্যাপক জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সঞ্চারের লক্ষ্যে তিনি এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর এ উদ্যোগের কারণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত সফল প্রভাব পড়েছে।
মালয় সাহিত্য ও সুফিবাদ চর্চা:
সৈয়দ নকীব আল-আত্তাস একজন উঁচুমানের সাহিত্যিক। তিনি ১৯৫৯ সালে ‘রংগকাজন রুবাইয়াত’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সুফিবাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক এবং মালয় ভাষীদের মাঝে সুফিবাদের চর্চা বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেন, ১৯৬৩ সালে। আর ১৯৬৫ তাঁর ডক্টোরাল থিসিস ‘হামজা ফান্সুরি’ গ্রন্থ আকারে (যেটি তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান বই) প্রকাশিত হয়। মালয় ভাষাবাসি সুফিবাদী মানুষদের জন্য এটি শ্রেষ্ঠতম এবং বিতরর্ক সৃষ্টিকারি গ্রন্থ, এটি। আল-আত্তাস ইসলামের ইতিহাস, ভাষা বিজ্ঞান এবং মালয় সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। আর এক্ষেত্রে তাঁর মেন্টর বা গুরু হলেন; হামজা ফান্সুরী। বস্তুত: মালয় ভাষায় ইসলামিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা এবং লেখালেখি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছে এবং ইসলামের মাহাত্ব মালয় ভাষা ব্যবহারকারিদের নিকট তিনি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে সাফল্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। তিনিই মালয় ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তীয় এবং দার্শনিকতার সূচনা ঘটান।
ইসলাম ও অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স:
সৈয়দ আল-আত্তাস মনে করেন, আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোন জিনিষ ‘শুধুই জিনিষ মাত্র’ এবং এতে বৈচিত্রময় বিশ্ব অধ্যয়নকে এর মধ্যেই সমাপ্তি ঘটিয়েছে। অবশ্যই তাতে বস্তুগত উপকারিতা বয়ে এনেছে, কিন্তু সাথে করে নিয়ে এসেছে প্রকৃতির নিজকে নিজে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে অনিয়ন্ত্রিত এবং অপূরনীয় ক্ষতি। তিনি এর তিব্র সমালোচনা করে বলেন যে, উচ্চতর আধ্যাত্নিক বিবেচনা না করে প্রকৃতিকে বুঝতে চেষ্টা করা এবং প্রকৃতির যথেচ্ছা ব্যবহার মানুষকে মানুষ প্রভু ভাবতে অথবা তাঁর সমকক্ষ বানাতে শিখেয়েছে। উদ্দেশহীন প্রচেষ্টা বা জ্ঞান অনুসন্ধানকে সত্যের পথ হতে বিচ্যুত করে দিয়েছে তা। ফলশ্রুতিতে, সে ধরণের প্রচেষ্টার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাগিত হয়েছে বলে তিনি তনে করেন। আল-আত্তাস পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেন, ‘এটা নিত্য পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তা হয়ে পড়ছে, তা কখনো অর্জন সম্ভবপর নয়, এমন কোন বিষয়ে পরিণত হযেছে।’ তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, অনেক প্রতিষ্ঠান এবং জাতি পাশ্চাত্যের এ ধরণের চেতনায় প্রভাবিত হয়েছে এবং অব্যাহতভাবে নিজেদের প্রয়োজনে তাদের অবস্থানকে উলট-পালট করে নিয়েছে এবং  মৌলিক উন্নয়ন লক্ষ্য হতে বিচ্যুত হয়েছে ও  পাশ্চাত্যের ধারণাকে গ্রহণ করার শিক্ষার লক্ষ্য হতে বিচ্যুতি ঘটিয়েছে। তিনি ইসলামিক অধিবিদ্যার কথা উল্লেখ করে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, বাস্তবতা; স্থায়ীত্ব এবং পরিবর্তনের সম্মিলিতরূপ বাহ্যিক পৃথিবীর স্থায়ী উপাদানগুলোতে অবশ্যাম্ভাবীরূপে পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। আল-আত্তাসের মতানুসারে ইসলামিক অধিবিদ্যা হলো; ঐক্যবদ্ধ একটি ব্যবস্থা, যা  মানুষের বোধের অতিযৌক্তিক এবং আন্ত:আধিপত্যে ইতিবাচকভাবে সহজাত প্রভৃতিকে প্রকাশ করে দেয়। তিনি এটাকে দার্শনিক সুফিবাদিতার দৃষ্টিকোণ হতে দেখেন। তিনি আরও বলেন যে, ইসলামী ঐতিহ্যে অপরিহার্যতাবাদী এবং অস্তিত্ববাদীরা বাস্তবতার প্রকৃতি বুঝতে পারে। এখানে প্রথম স্তরটির (অপরিহার্যতাবাদ) প্রতিনিধিত্ব করেন, দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং পরবর্তিতে সুফিগণ। অপরিহার্যবাদীরা মাহিয়ার (কুদিতী) নীতিতে অটল থাকেন। পক্ষান্তরে, অস্তিত্ত্ববাদিরা উজুদ নীতিতে বিশ্বাস করেন, যা একান্তই অন্তর্নীহিত অভিজ্ঞতার সারাতসার, শুধুমাত্র কোন যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা যুক্ত দিয়ে কোন বিষয় বিশ্লেষণ নয়। এটা নিশ্চিতভাবে দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক কল্পনা ধারাকে বস্তুর পূর্ব ধারণা এবং অস্তিত্ত্বের মূলস্তরে নিহীত, তা প্রকৃতির অধ্যয়নকে নিজেই অবসান ঘটায়। আল-আত্তাস অভিমত প্রকাশ করেন যে, মানস বাস্তবতার অতি উচ্চস্তর হলো অজুদ, যা বস্তুর সারাদসারের বাস্তব স্তর এবং এর পরবর্তী অবস্থান হলো মাহিয়াহ। এভাবে তিনি কোন বিষয়ের অতি গভীরে প্রবেশ করে বিশ্লেষণ করার সূক্ষদর্শি একজন প্রতিভাবান মানুষ।
সাফল্য ও কৃতিত্ত্ব:
আল-আত্তাস মালয় ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক উঁচু মর্যাদার স্তরে নিয়ে গেছেন; বিশেষত ভাষাশৈলী এবং শব্দভান্ডার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। তিনি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার দানের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার স্তরে মালয় ভাষার প্রচলন ঘটাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সস্টিটিউট অব মালে ল্যাংগুয়েজ, লিটারেচার এন্ড কালচার প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা করেন। তিনি প্রাচ্য ভাষাবিদ এবং ইসলামী ও মালয় সভ্যতার ন্ডিতজনদের দ্বারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন। আল-আত্তাস ১৯৭৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম শীর্ষক ২৯তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। সমসাময়িক কালের দর্শন শাস্ত্রের বিকাশে অনন্য অবদান রাখায় তিনি এম্পেরিয়াল ইরানিয়ান একাডেমী অব ফিলোসফি-এর ফেলো হিসেবে ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড অব ইসলাম ফেস্টিভাল-এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কন্ফারেন্সের বক্তা এবং ডেলিগেট ছিলেন। ১৯৭৭ সালে পবিত্র মক্কা শহরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষা বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও একজন বক্তা এবং ইসলামী শিক্ষার লক্ষ্য ও সংজ্ঞায়ন শীর্ষক একটি অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। ১৯৭৬-৭৭ সালে আল-আত্তাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলপিয়ায় টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে সিরিয়ার আলেপ্পোতে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক এক সভায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে সভাপতিত্ব করেন। পরের বছর ১৯৮৯ পাকিস্তানের তৎকালিন প্রেনিডেন্ট জিয়াউল হক আল-আত্তাসকে আল্লামা ইকবাল-এর জন্ম শতবার্ষিকী স্বর্ণ পদকে ভূষিত করেন। এভাবে তিনি দেশে-বিদেশে অনেক পদক ও পুরস্কার লাভ করেন। এক কথায় ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সমকালিন বিশ্বে আল-আত্তাস বহুমুখি প্রতিভার অধিকারি একজন জীবন্ত কিংবদন্তি বুদ্ধিজীবী।
উপসংহার: সৈয়দ মোহাম্মদ আল-নকীব বিন আলী আল-আত্তাস, সারা বিশ্বে জীবিত এবং পরলোকগমনকারি বিশ্ব মাপের লেখক, দার্শনিক এবং বুদ্ধিবৃত্তির জগতে বিচরণকারিদের মধ্যে অন্যতম একজন মনীষী। তাঁর কদর পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য জগতের সর্বস্তরে। মুসলিম দেশগুলোতে এমন ব্যাক্তিত্ত্ব বিরল। সাধারণত মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জন সহজাত ব্যাপার। আবার মার্কিন বা ইউরোপীয় এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশগুলোতে তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের আলোকে বড় মাপের মানুষদের পরিচিতি গড়ে ওঠে। আর ধর্মনিরপেক্ষ ও মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ মালয়েশিয়ায় জন্মগ্রহণকারি আল-আত্তাসের মত অত বড় মাপের মানুষ গরড় ওঠা অবাক-বিস্ময়ের ব্যাপার বৈ কি!

*  সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার, মহেশখালী, ককাসবাজার।

Education and Education Philosophy

শিক্ষার ইতিকথা
(পর্ব-০১)
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্*
শিক্ষা মানে আলো। মানব সন্তানরা যা দ্বারা আলোকিত হয়, তাই শিক্ষা। আলোকিত মানুষই মানব সমাজ ও সভ্যতাকে আলোকিত করে লাখতে পারে। কৃত্রিম কোন আলোর স্থায়িত্ব এ পৃথিবীতে ক্ষণ কালের। কিন্তু মানব আলো চিরকালিন, অমর। শাব্দিক অর্থে শিক্ষা হলো; এমন একটি কাজ বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে জ্ঞান বিতরণ বা জ্ঞান অর্জিত হয়, যুক্তি ও বিচার-বিবেচনা বোধ জাগ্রত হয় এবং সাধারণভাবে মানুষ নিজেকে বা অন্যকে বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিকশিত করে উন্নত একটি জীবন-যাপনের সন্ধান দেয়। শিক্ষা বলতে আমরা বুঝব; কোন পেশায় পারদর্শিতা অর্জনের জন্য বিশেষ কোন জ্ঞান বা দক্ষতা বিতরণ অথবা অর্জন করার কাজ বা প্রক্রিয়া। শিক্ষা শব্দটির অর্থ বুঝার জন্য আরও কয়েকটি ব্যাখ্যা বিবেচনা করা যেতে পারে; যেমন-কোন ডিগ্রী, স্তর অতিক্রমণ বা প্রাতিষ্ঠানিকতাকে অতিক্রমণ অথবা শিক্ষাদান, প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা অধ্যয়নের ফলে যা অর্জিত হয়, তাই শিক্ষা। শিক্ষাদানের বিজ্ঞান বা কলা-কৌশলই হলো শিক্ষা। আর শিক্ষা শব্দটি এত ব্যাপক ও গভীর অর্থবোধক যে এটাকে বিশেষ কোন সংজ্ঞা দিয়ে প্রকাশ করা করা কঠিন। তবে, বিখ্যাত ইংরেজ কবি জন মিণ্টন প্রদত্ত্ব সংজ্ঞাটির মাধ্যমে শিক্ষার একটি পূর্ণরূপ পাওয়া যায়। আর এ সংজ্ঞাটি অনেকটা সকল বিবেচনায় ও সার্বজনিনভাবে গ্রহণযোগ্য। জন মিল্টন বলেন; ‘মন, আত্না ও দেহের সামগ্রিক বিকাশ সাধনই হলো, শিক্ষা। আর একটা ছোট্ট সংজ্ঞা হলো; ‘মানব আচরণের বাঞ্চিত পরিবর্তনই হলো শিক্ষা।’ মালয়েশিয়ার সমসাময়িককালের প্রখ্যাত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ নকীব আল-আত্তাস বলেন; শিক্ষা হলো; “মন, দেহ ও আত্নার উন্নয়নের এমন এক স্তর যার প্রভাব প্রতিফলিত হবে আধ্যাত্নিক এবং প্রকৃতিসহ সকল মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক জীবন-যাত্রায়।” ব্যাপকার্থে শিক্ষা বলতে বুঝাবে; ‘ শিক্ষা গ্রহণ বা জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং অভ্যাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।’ আর সে শিক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি হতে পারে, গল্প বলা, আলোচনা, শিক্ষাদান, প্রশিক্ষণ দান এবং কারো তত্ত্বাবধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে। সাধারণত: শিক্ষার কাজটি ঘটে থাকে শিক্ষকের তত্ত্ববধানে অথবা স্বশিখণের মধ্যদিয়ে। শিক্ষা গ্রহণ চলতে পারে; আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকে এবং কোন অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে যা কারও চিন্তা, অনুভূতি এবং কাজকে প্রতিফলিত করে। শিক্ষাদানের পদ্ধতিকে শিক্ষাদানের বিজ্ঞান বা পেডাগগি বলা হয়। শিক্ষা গ্রহণের স্তরগুলোকে সাধারণত: নিম্নরূপে বিভাজিত করা হয়। যেমন-প্রাক-স্কুল বা কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা শিক্ষা নবীশ স্তর। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং প্রায় সকল সরকার শিক্ষাকে মানুষের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আবার অনেক দেশে শিক্ষা গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সভ্যতার আদিকাল হতে শিক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষা প্রদানের কাজ চলে আসছে। তবে প্রথম প্রথম মানুষের শিখণ-শেখানো চলত শুধু মুখে মুখে। প্রাক-সভ্যতার যুগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম  এ পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ চলে আসছিল। প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলন ঘটে গ্রীক সভ্যতায়। সেখান হতে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা প্রদানের প্রক্রিয়াটি বিকশিত হতে হতে আধুনিক ও অত্যাধুনিক এবং উচ্চতর তথ্য-প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যম বর্তমান শিখণ-শেখানোর যুগে এসে পৌঁছেছি আমরা। এ নিবন্ধে শিক্ষার ইতিহাস, দর্শন এবং সভ্যতার বিকাশ এবং শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বিষযগুলো পর্যালোচনাপূর্বক প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের শিক্ষা কার্যম নিয়ে দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাপটে আলোকপাত করার প্রয়াস চালাব। আর শিক্ষায় সৃজনশীলতার ধারণাটি বিশেষভাবে আলোকপাত করা হবে।
আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা:
গ্রীক সভ্যতায় প্লেটো এথেন্সে একাডেমি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইউরোপে সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের যাত্রা ঘটান। প্রাচীন গ্রীসের এতেন্স নগরীর পর খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে মিশরের আলেক্জান্দ্রিয়ায় দ্বিতীয় শিক।সা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। খ্রিস্ট পূর্ব তৃতীয় শতকে বিখ্যাত আলেক্জান্দেরিয়া লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৪৭৬ ক্রিস্টব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপীয় সভ্যতায় শিক্ষা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হয়। চীনের প্রাচীন দার্শনিক কন্ফুসীয় যুগের শিক্ষা চীন সমাজ এবং প্রতিবেশী কোরিয়া, জাপান এবং ভিয়েতনামে শিক্ষার প্রসার ও প্রভাব ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। কন্ফুসিয়াসের আকাংখা ছিল রাষ্ট্র তাঁর শিক্সা শিক্ষা চিন্তা ও ভাবনাগুলো বিকাশ ঘটাবেন এবং সুশাসনের কাজে তা অবদান রাখবে। আর তাঁর অনুসারিরা কন্ফুসীয় অমর শিক্ষা ভাবনা এবং বাণীগুলো লিখে রেখে পৃথিবীব্যাপী বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করে গেছেন। ফলে তাঁর শিক্ষা চিন্তা পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে তো বটেই আরব দেশগুলোতেও প্রশার ঘটেছিল। যে কারণে আমরা মহানবীর (দ:) একটি বাণীতে শিক্ষার জন্য চীন দেশে যেতে হলেও, যেতে বলা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (দ:) নিজেই মসজিদে নববীতে বসে কুরআন, সুন্নাহসহ দুনিয়ার তাবত সব বিষয়ে শিক।সা দিয়ে গেছেন। আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিতটি শক্তিশালী হয়, স্পেনে মুসলিম শাসনামলে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মাধ্যমে। এ ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ম শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ সকল ধরণের শিক্ষা গ্রহণের আধুনিক শিক্ষা ধারার বিকাশ ঘটে। আর উচ্চ শিক্ষা স্তরের অবাধ ও মুক্ত বুদ্ধি এবং বিশ্ব শিক্ষা চিন্তা ও চর্চার  বিকাশ ঘটার ক্ষেত্রেও মুসলমানরাই মরক্কোতে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। দ্বিতীয় আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিও প্রতিষ্ঠা করেছিল মুসলমানরা। তা ছিল মিশরের আল-আজহার বিশাবিদ্যালয়। ইউরোপে  রোমান সাম্রাজ্যের পতন-এর মধ্যদিয়ে প্লেটো প্রতিষ্ঠিত একাডেমি কেন্দ্রিক উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার ধারার বেশ কিছুদিন শিক্ষা গ্রহন এবং শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় ধর্মশালাগুলো। এভাবে প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চলে। মধ্যযুগের সূচনাকালে গির্জাসমূহের উদ্যোগে উন্নত শিক।সার চর্চার নিমিত্তে ক্যাথেডেরাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়। খ্রিস্টান গির্জার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষঠানসমূহ চার্টার্ড স্কুল হিসেবে অভিহিত হতো। পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে গড়ে ওঠা এসব শিক্ষা প্রষ্ঠিান ছিল সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর শিক্ষকগণ ছিলেন অতি উঁচু মানের মহত্তম ব্যাক্তিত্ত্ব। তাঁরা শিক্ষার্থীদের দৈহিক চর্চা, ভাষা বিজ্ঞান শিখণ, সংখ্যা শেখা ও অনুশীলণ, নৈতিক-মূল্যবোধ গড়ে তোলাসহ উচ্চ মানের মানব সম্পদ তৈরিতে অনন্য অবদান রাখেন। এসব প্রখ্যাত শিক্ষকগণের মাঝে নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ের থমাস একুইনাস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট গ্রোসেস্টেস্টি এবং সেন্ট আলবার্ট দ্যা গ্রেট প্রমুখ আধুনিক শিক্ষার থিত্তি রচনায় অনন্য অবদান রেখে গেছেন। ইসলামী খিলাফত-এর শাসনামলে ইউরোপের বিশাল অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার মালয়-চীন-জাপান পর্যন্ত আধুনিক এ ইসলামী শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার এবং বিকাশ ঘটে। ইউরোপের রেঁনেসাঁ আন্দোলন; জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, আর প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও সভ্যতার আলোকে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষাদানের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৪৫০ সালের দিকে জোহানেস গুটেনবার্গ একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান করে শিক্ষা ও সাহিত্যের দ্রুত প্রসার ঘটান। ইউরোপীয় সম্রাটদের যুগে দর্শন, ধর্ম শিক্ষা, চিত্রকলা এবং বিজ্ঞান শিক্ষার ধারার সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। চীন ইউরোপের মাঝে মিশনারি এবং জ্ঞানী-গুণি মানুষজন অন্যান্য সভ্যতার জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির ব্যাপক আদান-প্রদান এবং বিনিময়ের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করে শিক্ষাকে আধুনিকতার দারপ্রান্তে নিয়ে যান। এসময় ইউরোপীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুবাদের মাধ্যমে চীনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চীনের কন্ফুসীয় শিক্ষা দর্শনের প্রভাব পড়ে ইউরোপ জুড়ে। ইউরোপের এন্লাইটেন্টমেন্ট আন্দোলনের সাথে চীনা ধর্ম নিরপেক্ষতার শিক্ষার আলো পুরো ইউরোপকে আরও আলোকিতকরণে বিশাল ভূমিকা রাখে। আজ সারা পৃথিবীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানব সন্তানরা একটি নির্দিষ্ট বয়সকাল পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করার অবারিত সুযোগ পাচ্ছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ি বাধ্যতামূলক শিক্ষার নীতির কারণে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে মানব ইতিহাসে যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করবে।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদান ব্যবস্থা:
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চলে কোন নির্দিষ্ট অবকাঠোমো বা ভবনে। সাধারণত: স্কুল ভবনগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন বিষয়ে সনদধারী শিক্ষকদের দ্বারা বহুভাষিক ও জাতি-ধর্মের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিখণ-শেখানো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকে। এসব শিখণ-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষাক্রম, শিক্ষক নির্দেশিকা ও সহায়িকা, শারীরিক শিক্ষা নির্দেশিকা ব্যবহার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী আন্ত:ক্রিয়া, মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষের পরিসর, শিখন-শেখানো কার্যক্রম, উপকরণ এবং মাল্টি মিডিয়া ব্যবহারসহ অনেক কিছু সম্পৃক্ত।
প্রাক-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা:
আনুষ্ঠানিক বা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা স্তরে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করার সূচরা ঘটানোর আগে ৩ হতে ৭ বছর বয়সের নিয়ে এ স্তরের শিখণ-শেখানো চলে। বাংলাদেশে সাধারণত: ৫ বছরের উর্ধ্বে কিন্তু ৬ বছরের নিচে এমন বয়সের শিশুদের পড়াশোনার জন্য প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি প্রচলিত রয়েছে। দেশে-দেশে এ স্তরটিকে বিগত ৪/৫ বছর আগেও বর্তমানের ন্যায় অতটা গুরুত্ব দেয়া হতো না। কিন্তু জাপানসহ উন্নত-অনুন্নত বিভিন্ন দেশে প্রি-স্কুল শিক্ষাস্তরে অভাবনীয় উপকারিতা এবং সাফল্য লক্ষ্য করে সারা বিশ্বে মূল প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা পৃথকভাবে এস্তরে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষার স্তর:

সাধারণত: তিন স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম চলে, প্রায় সব দেশেই। আমাদের দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা; এই তিনটি স্তরে আমাদের দেমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তর; শিক্ষার্থীদের পাঁচ হতে সাত বছরব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ। সাধারণত: ৬ বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন শুরু হয়, শিশুদের। কোথাও কোথাও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরকে ইলিমেন্টারী শিক্ষা স্তরও বলা হয়। বিশ্বব্যাপী ৬ হতে ১২ বছর বয়সী শিশুরাই এ স্তরে পড়াশোনা করে থাকে। জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি (সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা)-এর লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে সকল দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করার কথা ছিল। আর বর্তমানে চলছে এসজিডি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পালা। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সারা পৃথিবীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্তর। এ স্তরকে উন্নত-অনুন্নত সব দেশই সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তাঁদের সবার উপলব্দি হলো, দেশ-জাতিকে উন্নত করতে হলে প্রাথমিক স্তর হতে শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে এবং তাদের কোমল মনে শিক্ষার তথা জ্ঞান জগতের উত্তম বীজ বপন করে দিতে হবে। অনেক দেশ আছে, যারা যেনতেনভাবে তাঁদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এতদিন চালিয়ে যাচ্ছিল। তারাও বুঝতে পারছে, প্রত্যেক দেশ-জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রগতিশীল ভাবনা-চিন্তা প্রাথমিক শিক্ষা স্তর হতে সূচনা ঘটাতে হবে। সৌদি আরবসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলিম দেশগুলো যারা ভেবেছিল ধর্মীয় ভাবধারা সংবলিত শিক্ষা দিয়ে দেশকে-জাতিকে উন্নত করবে-এগিয়ে নিবে, তারাও শিক্ষাকে সংস্কার করে আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহন করেছে।ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে সাম্প্রতিক কালে শিক্ষায় পরিবর্তণ-পরিমার্জন করছে, তারা। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত-চীন-জাপান, এমন কি শ্রলংকাও অনেক আগে এ সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করে সুফল ঘরে তুলছ। বাংলাদেশ কেন এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে? তাই, বাংলাদেশ সরকারও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের সংস্কার ও উন্নয়নে ইতোমধ্যে অনেক কর্মসূচি গ্রহন, বাস্তবায়ন এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে। সাফল্যের পালে যোগ হচ্ছে নিত্যদিনের শিক্ষা অগ্রগতির হাওয়া। দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন যাই হোক না কেন, শিক্ষা কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকটি সবাইকে ভাবতে হবে।

Progressive Education Thoughts

প্রগতিশীল শিক্ষা ভাবনা
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্*
শিক্ষা নিয়ে যুগ যুগ ধরে ভেবে আসছেন; দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীগণ। বিগত তিন শতাব্দী ধরে চেষ্টা চালানো হচ্ছে কীভাবে শিক্ষা চিন্তা ও শিক্ষা পদ্ধতিতে সনাতন মার্কিন-ইউরোপীয় ধারাকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজানো যায়। কর্মমুখি বা অভিজ্ঞাতার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণই প্রগতিশীল শিক্ষার মূল। উনবিংশ শতকের শেষার্ধে প্রগতিশীল শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয় এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষত: উচ্চ শিক্ষা স্তরের জন্য প্রগতিশীল শিক্ষা চিন্তার ও ভাবনার উদ্রেগ ঘটে। প্রগতিশীল শিক্ষা চিন্তার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিন্মরূপ;
-এ শিক্ষা পদ্ধতিতে কর্মের মাধ্যমে শিখণ, প্রকল্পের মাধ্যমে শিখণ, ভ্রমণ ভিত্তিক শিখণ; প্রভৃতির উপর জোর দেয়া হয়।
-নির্দিষ্ট থিম নিয়ে সমন্বিত শিক্ষাক্রম সাজানো হয়।
-শিক্ষায় উদ্যোক্তা গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব পায়।
-সমস্যা সমাধানমূলক এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং (গভীর চিন্তন)শিখন প্রাধান্য পায়।
-দলীয় কাজ এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির উপর দৃষ্টি দেয়া হয়।
-মুখস্থকরণেরে চেয়ে বোধগম্যতা অর্জন এবং কর্মমুখিনতা গুরুত্ব পায় বেশি।
-এটি সহযোগিতামূলক এবং সহায়তামূলক পজেক্ট পদ্ধতি।
-সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের জন্য শিক্ষা ভাবনা এটি।
-প্রত্যেক একক ব্যাক্তি লক্ষ্য অর্জনের বিবেচনায় অতিমাত্রায় ব্যাক্তিগত শিক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি এটি।
-সামাজিক সেবা এবং সেবামূলক শিখণের সমান্বত রূপ এটি।
-ভবিষ্যত সমাজের চাহিদা অনুযায়ি বিষয়সূচি নির্বাচন করা হয়ে থাকে।
-বৈচিত্রময় শিখণ বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পাঠ্যবইয়ের প্রাধন্যি হ্রাস করা হয়।
-জীবনব্যাপী শিখণ এবং সামাজিক দক্ষতা বিকাশকে এতে জোর দেয়া হয়।
-শিক্ষার্থীদের প্রকল্প কর্ম এবং সৃষ্টিশীল কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
প্রগতিশীল শিখণ তত্ত্ব:
প্রগতিশীল শিক্ষা ভাবনার জনক জন ডিউই হলেও এ ধারণার অগ্রদূত হলেন; জন লকা এবং জাঁ জক রুশোঁ। লক বিশ্বাস করতেন যে, সার্বজনীন বা প্রতিষ্ঠিত ধারণাসমূহকে প্রাধান্য দেয়ার চাইতে পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই সত্য ও জ্ঞান অর্জিত হয়। তিনি আরও বলেন, শিখণ অর্জনে শিক্ষার্থীদের নিবীড অভিজ্ঞতা লাভের প্রযোজনীয়তা রয়েছে। রুশো লকের ভাবনাকে আরও গভীরতর রূপ দেয়ার ভাবনায় যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, শিক্ষকদের প্রতি ভক্তি এবং তথ্যাদি মুখস্থকরণের মাধ্যমে শিক্ষা লাভ হবে না।
জোহান বার্ণহার্ড বেসডাউ: তিনি ১৭৭৪ সালে ডেসাউয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। লকা ও রুশোর ভাবনা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এখানে আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে কর্মের মাধ্যমে শিখণ-শেখানোকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হত। তিনি শিশুদের সাথে কথোপকথন ও খেলা-ধুলায় মেতে ওঠে এবং শারীরিক বিকাশ ঘটানোর পদ্ধতি অবলম্বন করে তাঁর নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতির সূচনা ঘটান। তিনি এ ধারণাকে ভিত্তি করে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। খ্রিস্টিয়ান গটিল্ফ সালজমান, জন হেনরিখ পেস্টালোজি, ফ্রেডরিখ উইলহেল্ম ফর্বেল, জন ফ্রেডরিখ হার্বার্ট, জন মেলিখয়র বসকো, সেইল রেড্ডি প্রমুখ শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী প্রগতিশীল শিক্ষা ভাবনার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান। এঁদের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৮০ সালে সূচিত প্রগতিশীল শিক্ষা আন্দোলন মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থাকে অংকুর হতে য়ুলে ফলে সুশোভিত করে সারা বিশ্বে শীর্ষ শিখরে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৮৮০ হতে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী জন ডিউই এ আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল শিক্ষাস্তরে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়।তাঁর মতে শিক্ষা হলো; ‘‘জাতির সামাজিক সচেতনার মধ্যে ব্যক্তি বিশেষের অংশগ্রহণ।” শিক্ষার্থীকে সামাজিক জীব হিসেবে গণ্য করে শিখণ-শেখানো পরিচালনা করতে করবে। জন্মের পর থেকেই অবেচতনভাবে শিশুর শিশুর জ্ঞান অর্জন প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে এবং ধীরে ধীরে তাদের জ্ঞানজগতের বিকাশ ঘটে ও সমাজে তা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রক্রিয়ার দু‘টি দিক আছে, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক। আর এদুটির ভিত্তি হলো; দৈহিক সামর্থ। একটি শিশুর সহজাত বুদ্ধি-বিবেচনা এমন এক পর্যায়ে তাদেরকে পৌঁছে দেয় যে, তারা তাতে মানুষ হয়ে ওঠে। জন ডিইউই‘র মতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের অংশ। আর এধারণার ব্যাত্যয় ঘটলেই শিক্ষা ব্যর্থ হয়। সমাজ মনে করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু তথ্য দেয়া হয়, কিছু পাঠ শেখানো হয় অথবা কিছু মানবাচরণ গড়ে উঠে। ডিউই মনে করেন যে, শিক্ষা যেহেতু সমাজ গঠনের সহায়ক উপাদান, তাই এটি সমাজের অংশ এবং সমাজে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তাঁর মতে ‘শিক্ষা হলো জীবন যাপনের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যত জীবন যাপনের প্রস্তুতি নয়।’ তাই স্কুলে অবশ্যই বর্তমান জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হবে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের গৃহজ জীবন (যেমন নৈতিক এবং নীতিগত শিক্ষা) স্কুল প্রক্রিয়ায় অংশ। শিক্ষক এর অংশ বিশেষ, কর্তৃত্বপরায়ণ কেহ নন, সমাজের অংশরূপে তিনি সেখানে শিক্ষার্থীদেরকে সহায়তা করেন। ডিউই‘র মতানুসারে বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে সমাজের প্রফিলন থাকতে হবে। মূল পাঠ্য বিষয়ের(যথা-ভাষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি)-এর সাথে রান্না, সেলাই এবং প্রচলিত বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন। অধিকন্তু, তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে, অধ্যয়নের ফল হিসেবে অগ্রগতি অর্জন হয় না, কিন্তু তা ঘটে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নতুন আগ্রহ জাগ্রত হয়। শিশুর সামর্থ্য ও আগ্রহের ওপর নির্ভর করবে শিখণ পদ্ধতি। যদি শিশুর ওপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। হেলেন পার্খোস্ট, রুডলফ স্টেইনার, মারিয়া মন্টেস্সোরি, রবার্ট ব্যাডেন পাওয়েল প্রমুখ জন ডিউই‘র শিক্ষা ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন। সনাতনী শিক্ষায় বাহ্যিক প্রণোদনা; যেমন গ্রেড ও পুরস্কার প্রদান প্রকাশ পায়। আর প্রগতিশীল শিক্ষাভাবনা অন্তর্নীহীত শিশুর আগ্রহমূলক কর্মকান্ড ভিত্তিক প্রণোদনা প্রকাশ পায়। প্রশংসাই মোটিভেশন বা প্রেরণা যোগানোর ভূমিকা পালন করে থাকে।  
একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতাসমূহ: দ্রুততম সময়ে পরিবর্তমান, ডিজিটাল সমাজ এবং কর্মস্থলের প্রেক্ষাপটে একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা হলো, কতগুলো উচ্চতর দক্ষতা, সামর্থ্য এবং শিখণ-শেখানোর সমষ্টি বিশেষ।ফ্রান্স, জার্মান, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশে প্রগতিশীল শিক্ষা ভাবনার প্রতিফলন ঘটানো হচ্ছে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে প্রগতিশীল শিক্ষা ধারায় উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে। ভারতে বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের শিক।ষা ভাবনার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটে।
সনাতন এবং প্রগতিশীল শিক্ষা ভাবনার পার্থক্য:
সনাতন
প্রগতিশীল
বিদ্যালয় হলো জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্র।
বিদ্যালয় হলো জীবনের অংশ বিশেষ।
শিক্ষার্থীরা হয়ে থাকে পরোক্ষ তথ্য ও কর্তৃত্ব গ্রহণের মাধ্যম।
শিক্ষার্থীরা সক্রিয় অংশগ্রহণকারি, সমস্যা সমাধানকারি ও পরিকল্পনাকারি।
শিক্ষকগণ হন তথ্য ও কর্তৃত্ত্বের উৎস।
শিক্ষকগণ হন সহায়ক, নির্দেশক এবং চিন্তার উদ্রেককারি।
অভিভাবকগণ হন বহিরাগত এবং বিচ্ছিন্ন।
অভিভাবকগণ হন প্রথম শিক্ষক, লক্ষ্য নির্ধারণকারি, পরিকল্পনাকারি এবং অর্থ যোগানদাতা।
জণগোষ্ঠী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন না, অর্থ যোগান দেন মাত্র।
জনগোষ্ঠী শ্রেণি শিখণ-শেখানোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কেন্দ্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং পরিচালিত হয়ে থাকে।
সকল অংশিজনের অংশগ্রহণ থাকে।
বাহ্যিক দিকগুলোকে বিশেষত ফলাফলগুলোকে বিবেচনায় কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়।
মিশন বা লক্ষ্য, দর্শন এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
শিখণ অর্জিত হয় নির্ধারিত, পুঞ্জিভুত তথ্যরাজি এবং অর্জিত দক্ষতা ব্যবার করে।
ক্রমান্বয়ে, গভীর ও ব্যাপক পরিসরে শিখণ অর্জিত হয়।
বক্তৃতা, লেকচার শীট ও পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জিত হয়।
খেলাধুলা, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক আন্তক্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়।
শেখানো অনুশীলণ করানো হয় পূর্ব নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং শুদ্ধ উত্তর চর্চার মাধ্যমে।
শিক্ষার্থী কতৃক প্রশ্নকরণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে শেখানো হয়।
পাঠ্য বিষয়বস্তু, বিশেষত ভাষা ও গণিত বিষয় আলাদা আলাদা।
শিক্ষার্থীদের পছন্দানুযায়ি পাঠ্য বিষয়বস্তু নির্ধারণ হয়ে থাকে।
দক্ষতাসমূহ অর্জন করানো হয় বিক্ষিপ্তভাবে ও সেগুলোকে লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রগতিশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে দক্ষতাসমূহ অর্জন করানো হয় পাঠ্য বিষয়বস্তুর অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে এবং তা কৌশল হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
মূল্যায়ন চলে গতানুগতিক, বাহ্যিক এবং মান নির্ধারণ করে।
নতুন নতু কৌশল নির্ধারণ, চাহিদা চিহ্ণিতকরণ এবং উন্নয়ন লক্ষাভিমুখি মূল্যায়ন করা হয়।
সাফল্য বিবেচনা করা হয় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে, মুখস্থ ও স্মৃতি নির্ভরতা এবং নির্ধারিত সময় বা স্থান বিবেচনায়।
সাফল্য বিবেচনা করা হয় নিত্যকার প্রায়োগিক চর্চা এবং সহায়তাকরণের মাধ্যমে।
সনদ অর্জনই শেষ কথা।
সনদ অর্জনই শেষ কথা নয়, প্রিক্রিয়া অব্যাহত রাখাই মুখ্য।
ভাষা দক্ষতা এবং যৌক্তিক/গানিতিক দক্ষতার পরিমাপক হলো বুদ্ধিমত্তা।
বৃদ্ধিমত্তার বৈচিত্রায়নকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, এতে
শিল্প কলাসহ সবকিছু এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর এতে বাস্তব জীবনধর্মী সমস্যা সমাধানমূলক পরিমাপক ব্যবহার করা হয়।  
স্কুল বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নির্দিষ্টকালের জন্য।
স্কুল হবে জীবনের একটি কঠিন ও মজার মধ্য দিয়ে কাঠানোর অংশ।
উপসংহার: প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার সময় হতে ইউরোপীয় এন্লাইটেনম্নেট সময়কাল পার করে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থায় উনবিংশ শতকের শেষার্ধে একটি বড় ধরণের ঝাঁকুনি দেয়, প্রগতিশীল শিক্ষা চিন্তা-ধারা। জন লকা, রুশোর হাত ধরে জন ডিউই একে পূর্ণতা দেন। আর তা ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে ব্যাপক অনুসৃত এবং অনুশীলণ করা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এস মার্কিন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ব্লুম প্রমুখ এসে তাতে যোগ্যতা ভিত্তিক বা সৃজনশীল শিখণ-শেখানো এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙযোজন করেন। তথ্য-প্রযুক্তির সংযোজন শ্রেণি শিখণ-শেখানোতে অত্যাধুনিকতার আবহ সৃষ্টি করেছে বর্তমানে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে শিক্ষা গ্রহণ, শিক্ষা দান এবং শিক্ষা গ্রহণে নানা কৌশল অবলম্বন. পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা ও সংস্কার-পরিমার্জন এখনো চলমান। এসব হয়ত চলতেই থাকবে। মানুষের মন বড়ই অস্থির। আর তা ঘটে দেশ-অঞ্চল-এলাকা বিশেষে। এসব হয়ত ইহকালব্যাপী চলতে থাকবে। 

*সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার; মহেশখালী, কক্সবাজার।

Mackley and Education in British-India

মেকলে ও বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্*
বৃটিশরা দু‘শ বছর ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছে। তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে এতদাঞ্চলে অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছে। তাদের রেখে যাওয়া অনেক কিছুর জের আমরা এখনও বহন করে যাচ্ছি। কিন্তু তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের জন্য ভাল কাজ করে গেছে। এরমধ্যে প্রশাসন, আইন পরিষদ, বিচার ব্যবস্থা, আইন-কানুন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকতার রূপদান অন্যতম। ভারত উপমহাদেশভুক্ত দেশগুলোতে তাদের প্রতিষ্ঠিত ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব আমরা বর্তমানেও দেখতে পাই। বৃটিশ শাসনামলে তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এখানে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে কমিশন গঠন, শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে গেছে, তারা। এ নিবন্ধে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ও মেকলে কমিশনের আলোকে একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হবে।
বৃটিশ-ভারতের শিক্ষার পটভূমি:
১৭৫৭ সালে বৃটিশরা ভারত উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। তাদের অনুগত একদল শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি করার প্রয়াস চালায় তারা। গভর্ণর ওয়ারেন হেস্টিংস ১৮১৩ সালে চার্টার এক্ট অনুযায়ি ১৭৮১ সালে মুসলমানদের অনুরোধে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোনস এশিয়াটিক সোসাইটি গড়ে তুলেন। প্রাচ্যবিদ ও ফার্সি ভাষার পন্ডিত উইলিয়াম উইলকিন্স, হোরেইস হ্যাম্যান উইলসন, নাথানিয়াল হেলহেড প্রমুখ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় জোনসের সহযোগি ছিলেন। ১৭৭৮ সালে চার্লস উইলকিন্স বাংলা ভাষায় টাইপ রাইটার উদ্ভাবন করেন। প্রথম বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন হেলহেড। আর ১৭৯২ সালে জনাথন ডানকান বেনারসে সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করেন। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেনলি বৃটিশ কোম্পানীর কর্মচারিদেরকে ভাষাগতভাবে সচেতন করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৩ সালে চার্টার আইন পাশ করে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে এক লক্ষ রোপী বা টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ১৮২৪ সালে জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্স্ট্রাকশনস গঠন করা হয়। এরমধ্যে ১৮২৪ সালে লর্ড এ্যামহেস্ট কলকাতায় প্রাচ্য শিক্ষার প্রসারকল্পে ‘সংস্কৃত কলেজ’ স্থাপন করেন। রাজা রামমোহন রায় এ ব্যবস্থার বিরোধীতা করেন। বৃটিশ শাসক লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক বিশ্বাস করতেন, উপরের স্তর হতে শিক্ষা নিন্ম স্তরের দিকে প্রসারিত হবে। এতে সরকারের তহবিল কম প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি পাশ্চাত্য শিক্ষা সম্প্রসারিত হবে। এরমধ্যে বৃটিশ ইতিহাসবিদ স্যার টমাস বেবিংটন মেকলে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর পরামর্শে। ১৮৩৮ সালে মেকলে প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতির আলোকে শিক্ষার সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। অত:পর ১৮৩৫ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর উদ্যোগে কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং একই বছর (১৮৩৫) দ্যা এ্যালফিনস্টোন ইন্সস্টিটিউট অব মোম্বে প্রতিষ্ঠা করা হয়। লর্ড হার্ডিং ১৮৪৪ সালে ঘোষণা দেন যে, ইংরেজি জানা ভারতীয়রা সরকারি চাকুরিতে সুযোগ পাবে। ফলে, ভারতীয়রা ইংরেজি ভাষা শিখণের প্রতি উৎসাহিত হয়ে ওঠে। ১৮৫৪ সালে বৃটিশ-ভারতে স্যার চার্লস উড শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্ব নিন্মস্তর এবং উচ্চ স্তরের মধ্যে সমন্বয় করার প্রস্তাব দেন। এটা চার্লস ডেচপাস নামে অভিহিত। আর ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে এটা ‘মেঘনা কার্টা’ নামে পরিচিত। চার্লসের শিক্ষা সংস্কার সুপারিশমালার প্রধান দিকগুলো ছিল নিন্মরূপ;
১. ভারত উপমহাদেশে পৃথক একটি শিক্ষা বোর্ড গঠন করতে হবে।
২. কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।
৩. শিক্ষক এবং শিক্ষাদানের উপযোগি পরিবেশ নিশ্চিতকরণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. সরকারি স্কুল এবং কলেজগুলোকে সংস্কার করতে বলা হয়, এতে।
৫. মধ্যস্তরের জন্য নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করা হয়।
৬. বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদান প্রদানের ব্যবস্থাকরণ।
৭. গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও উন্নয়ন।
৮. নারী শিক্ষা, গণ শিক্ষা, আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসার এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৯. সরকারি স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধিকরণ, পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যবস্থাকরণ, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

চার্লস উড-এর সুপারিশ অনুযায়ি বৃটিশ সরকার; কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল। ১৮৫৫ সালে সরকারি স্কুল পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এর অধীনে ৭৯টি ইংলিশ স্কুল এবং ১৪০টি সরকারি অনুদাপ্রাপ্ত নেটিভ স্কুল ছিল। চার্লস উড ভারতে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সুপারিশ অনুসারে ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৮২ সালে লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৮৮২ সালে স্যার উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে বৃটিশ শাসক লর্ড রিপনের শাসনামলে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ১৮৮৪ সালে নিন্মোক্ত সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন।
-স্কুল এবং কলেজগুলোতে সরকারি অর্থ প্রদান করা হবে।
- স্কুল এবং কলেজের উপর থেকে সকল প্রকার নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়া হবে।
-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হবে স্থানীয় সরকার এবং জেলা পরিষদের অধীনে।
-উচ্চ শিক্ষার উপর বিশেস জোর দেয়া হবে।
১৯০২ সালে স্যার থমাস রেলফের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্ষেত্রের অধিকতর সংস্কারের লক্ষ্যে রেলফ কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ইন্ডিয়ান ইউনির্ভাসিটি কমিশন নামেও পরিচিত। স্যার গুরুদাস ব্যানার্জী এবং ষেয়দ হোসাইন বিলগ্রামী এ কমিশনে ভারতীয় সদস্য ছিলেন। ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়। এ আইন অনুযায়ি ১৯১৭ সালেিএকটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। স্যার মাইকেল স্যাডলার ছিলেন এ কমিশনের উপদেষ্টা। এটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন নামেও খ্যাত।
মেকলে ও ভারতে আধুনিক শিক্ষার বিকাশ:
ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তিনটি সংগঠন মূর ভূমিকা পালন করে। ক্রিস্টান মিশনারি, বৃটিশ সরকার এবং বৃটিশ সরকারের প্রিগতিশীল আইন ব্যবস্থা। খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টীয় ধর্ম ও আদর্শ প্রচার এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য পুরো ভারত উপমহাদেশ জুড়ে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তাদের প্রতিষ্ঠিত এসব স্কুলে আধুনিক ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতির পাশাপাশি ক্রিস্টান ধর্মীয় শিক্ষাও বিস্তার লাভ করে। ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানোতে বৃটিশ সরকারে প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও জনপ্রশাসন এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। তারা মনে করেছিল যে, বৃটিশ সংস্কৃতির প্রসার বিশ্ব ব্যবস্থায় সামাচিক ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। আধুনিক শিক্ষা আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার দার উন্মোচিত করে দিয়েছিল। এতে ধার্মিকতার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছিল। তাছাড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রের প্রসার ঘেটিয়েছিল। পরে প্রকাশনা শিল্প কারখানা গড়ে এবং ছাপা বইপত্র ব্যাপকভাবে সারা ভারত উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। এতে ধর্মগ্রন্থসমূহও সাধারণ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে যায়। শিক্ষায় আধুনিকতার প্রচলন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য সকল বিষয় পড়া, অধ্যয়ন করা এবং চর্চা করার অবাধ সুযোগ-সুবিধা অবারিত করে দেয়। এভাবে ভারতে এবং উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে।
মেকলে এবং ভারত উপমহাদেশে শিক্ষার প্রসার: স্যার টমাস জোন্স বেবিংলী মেকলে ছিলেন বৃটিশ ইতিহাবিদ এবং রাজনীতিক। তিনি প্রচুর লেখালেখি করেনে এবং প্রবন্ধকার হিসেবে সুপরিচিত। তিনি ১৮৩৫ সালে প্রকাশিত মেকলে মাইনিউটস নামক ভারতের শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনার মাধ্যমে ভারতে ইংরেজি ভাষা শিখণ এবং পাশ্চত্য সংস্কৃতির বিকাশে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন। তিনি সরকারি দফতরগুলোতে ফার্সি ভাষার স্থলে ইংরেজি, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় শিখণ-শেকানো এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শি শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে মুখ্য অবদান রাখেন। তার শিক্ষা ভাবনা মেকলেবাদ নামেও খ্যাত। তাঁর মতে মেকলে পৃথিবীকে সভ্য জাতি এবং বর্বর জাতি এ দুভাগে ভাগ করেছিলেন। তিনি মাইনিউটসে মন্তব্য করেন যে সারা ভারতের সংস্কৃতি ভাষার রচনাবলি সংগ্রহ করে একত্রিত করা হলে, তা বৃটেনের প্রাথমিক স্তরে চর্চা করা জ্ঞানের চেয়ে কম মূল্য বহন করে। মেকলে ছিলেন উদার এবং মুক্ত শিক্ষা দর্শনে বিশ্বাসী। মেকলে ১৮০০ সালে বৃটেনের স্কটল্যান্ডে এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হার্টফোর্ডশায়ার-এর একটি বেসরকারি স্কুলে এবং কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনা করেন। বেমব্রিজে পড়াশোনা করার সময় তিনি কবিতা লিখতেন এবং এজন্য পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টার হলেও, তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল আইন পেশার চেয়ে রাজনৈতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রতি। মেকলে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতেন। তিনি ভাল বক্তা ছিলেন। ১৮৩২ সালে তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হন। ১৮৩২ সাল হতে ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত বৃটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ১৯৩৪ সালে ভারত আসেন এবং ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশ-ভারত সরকারের শীর্ষ পদে ছিলেন। ১৮৩৫ সালে তিনি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার প্রচলন এবং বিকাশ ঘটানোর জন্য বিখ্যাত মাইনিউটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। সেসময় ভারতে সংস্কৃত বা ফার্সি ভাষায় শিক।ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করানো হত। মেকলে যক্তি প্রদর্শন করেন যে, ভারতে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়া চলবে না, তাদেরকে কয়েকটি বিদেশী ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষার্থীরা বেশি কিছু শিখতে পারে না, তাদেরকে ইংরেজি ভাষায় শিখণ-শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে বলে, তিনি মতামত দেন। মেকলে আরও মন্তব্য করেন যে সংস্কৃতি বা আরবী ভাষায় কবিতা বেশি লেখা হয়েছে বটে, কিন্তু ইউরোপীয় সাহিত্য এ দুভাষার সাহিত্যের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং ব্যাপক। অতএব ভারতীয়দেরকে ইউরোপীয় শিক্ষা, দর্শন, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করে তুলতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন ইংরেজি ভাষা শিক্ষা এবং এর প্রসার ঘটানো। তিনি ষষ্ট শ্রেণি হতে পরের শিক্ষা স্তরগুলোতে শিখণ-শেখানোর মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করে দেয়ার প্রস্তাব করেন। এতে ইংরেজ ঘেসা ভারতীয় একদল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থেরি হবে এবং তার বৃটিশ ও ভারতীয়দের মাঝে সাংস্কৃতিক দুতিয়ালির ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।এটা দৃশ্যত অসম্ভব মনে হলেও, বৃটিশ শাসন ব্যবস্থার স্বার্থে তা করতেই হবে। শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি ভারতীয় প্যানেল কোড প্রচলনেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর মেকরৈ প্রস্তাবিত প্যানেল কোড আইনে পরিণত করা হয়। অতপর ১৮৭২ সালে ভারতে ফৌজদারি দন্ডবিধি আইনও কার্যকর করা হয়। আর ১৯০৯ সালে দেওয়ানী দন্ডবিধি কার্যকর করা হয়। ক্রমান্বয়ে বৃটিশ-ভারতের আইন-কানুন, বিধি-বিধান, রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতিসহ অনেক বিষয়ে মেকলে অবদান রাখেন। বিশেষত; শিক্ষার আধুনিকায়নে মেকলে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রণীত রূপরেখা অনুসারে বৃটিশ-ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় চার্লস উডসহ অন্যান্য শিক্ষাবিদগণ বিভিন্ন কমিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর নিজ নিজ দেশের সরকার তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষার্থীদের মেধা-মননসহ সকল দিক বিবেচনায় বৃটিশ শাসন ও ঐতিহ্যের ধারায় বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পেরিচালিত হয়ে আসছে।
রাজনীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মেকলে:
বৃটিশ জাতি রাজনীতি, কূটনীতি, সমরনীতি, রাজ্য দখল ও শাসন বিস্তারের ক্ষেত্রে এক সময় একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। পাশাপাশি, বুদ্ধিবৃত্তির জগত, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, দর্শনসহ সকল ক্ষেত্রে মানব সভ্যতার বিকাশে তাদের অবদান রয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার শেক্শপিয়ার, কবি ও দার্শনিক জন মিল্টন, রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আধুনিক কবি টি.এস এলিয়টসহ অনেক বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানীর জন্মধাত্রী হলো বৃটিশরা। তাছাড়া, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ডসহ প্রাচীন বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বৃটেনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালিন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টাইন চার্চিল নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। মেকলেও বৃটিশ জাতির সৃষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ১৮৩৮ সালে তিনি বৃটেনে ফিরে যান এবং সেদেশে এম.পি। সেখানকার অনেক কিছুতে স্যার টমাস জোন্স বেবিংলি মেকলের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৮৬০ সালে তিনি পরলোক গমন করেন।
উপসংহার: বৃটিশরা এ উপমহাদেশে এসেছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য। তারা ব্যবসায়ির বেশে এসে এখানে দু‘শ বছর শাসন-শোষণ করে গেছে। উলট-পালট করে গেছে; ভারত উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, সমরনীতি, কূটনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি; সবকিছু। কিন্তু তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আইনের জগতকে একটি আধুনিক ভিত্তি দিয়েছে। বিশেষত: ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য শিখণ-শেখানো এবং অনুশীলণ কার্যক্রমের ব্যাপক বিস্তার ও প্রসারতা ণেলাভের কার ভারত উপমাহদেশীয় জাতি এবং দেশগুলো অনেক উপকৃত হয়েছে। বিশ্ব দরবারে এখানকার মানুষদের বিচরণের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে, তারা। স্যার টমাস জোন্স বেবিংলি মেকলে, চার্লস উড, হান্টিংস, সেটলার প্রমুখ বৃটিশ শিক্ষাবিদ; এতদাঞ্চলের  শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন।
*সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার; মহেশখালী, কক্সবাজার।

Modrnism in Education: Various Technics

শিক্ষায় আধুনিকতা: শিখণের
কিছু ভিন্ন ভিন্ন কৌশল
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ
শিক্ষায় ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার শিখণ-শেখানো কার্যক্রমে অত্যাধুনিক ভাবনার সংযোজন। এর ফলে শিক্ষার সকল স্তরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক নতুনত্ব এবং ধ্যান-ধারণার উদ্ভাবন ঘটিয়েছে। সনাতন পদ্ধতির শ্রেণি পাঠদানে গভীর প্রভাব ফেলেছে, এটি। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয়ের ভবনায় এবং কাজে এর প্রভাব দিন দিন দৃশ্যমান হয়ে ওঠছে। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন এবং ভিডিও-অডিও ব্যবহার করে শ্রেণি পাঠদান পদ্ধতি সারা বিশ্বে অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছে। উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগেই এর প্রচলন ঘটেছে। এশিয়ায় চীন, জাপান, ভারতসহ সকল দেশে শিখণ-শেখানো কাজে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বিশাল প্রভাব ও প্রসার ঘটেছে। তাঁরা শিক্ষকগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ তৈরি, প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম সরবরাহসহ যাবতীয় কাজে বেশ উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমান সরকার সকল স্তরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া সরবরাহ করেছে এবং এক বছরের মধ্যে হয়ত সকল প্রতিষ্ঠানে তা পৌঁছে যাবে। এ নিবন্ধে একজন মার্কিন শিক্ষাবিদের ধারণার আলোকে শ্রেণি শিখণ-শেখানোতে বিশ্বব্যাপী ৪৮টি টি নতুন কলা-কৌশলের প্রয়োগ বিষয়ে আলোকেপাত করার প্রয়াস চালাব।
১. শ্রেণিকক্ষে বৈচিত্রতা আনয়ন: আধুনিক শিক্ষাবিদগণ উচ্চতর তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারতা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণি শিখণ-শেখানোর সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চলন-বলন, লিখন, আদেশ-নির্দেশ-উপদেশ দান এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিতে নিত্যই নতুনত্ত্ব নিয়ে আসছেন। তাঁদের ভাবনা সনাতন পদ্ধতিতে পাঠদানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শিখণফল বা যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। সুতরাং শিক্ষকদেরকে নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের সনাতন ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। নিজেদেরেকে এ যুগের শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ি পাঠদান করার পদ্ধতি আয়ত্ত্ব করে নিতে হবে। প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে এমন শিক্ষার্থী যদি ২০১৭ সালে ৬ মাস পার করার পরও বাংলা বইয়ের পাঠ্যাংশ বিশেষ পড়তে পারবে না, এটা কোন মতেই মানা যায় না। অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকগণকেই কাজটি করতে হবে।
২. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগাতে হবে: অন-লাইনে আজকাল হাজার হাজার শ্রেণি শিখণ-শেখানোর কন্টেন্ট ও উপকরণ পাওয়া যায়। ইউটিউব, শিক্ষক বাতায়ন, মুক্ত পাঠ, ব্যক্তিগত ও গ্রুপ ভিত্তিক শিক্ষকগণের বিবিধ ব্লগে প্রবেশ করলে, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকগণ তাঁদের পছন্দ মত পাঠ পরিকল্পনা ও পাঠ সহজেই খুঁজে পাবেন। তাছাড়া, ফেসবুকেও প্রচুর শ্রেণি পাঠদানের উপকরণ ও লেখা-লেখি পাওয়া পাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত সকল স্তরের শিক্ষকগণ অন-লাইনে নিজেদের কর্মকান্ড বিস্তার করুন্ নিজেকে সমৃদ্ধ করুন, নিজের ভাবনা-কাজ-চিন্তা অন্যকে শেয়ার করুন এবং নিজেদেরেকে দক্ষ ও উপযোগি করে নিন।
৩.শিক্ষা, শিক্ষাদান ও শিখণ-শেখানো বিষয়ে কথা বলুন: আদি যুগ হতে মানব সমস্যা ও চাহিদার অন্ত নেই্। আর এসব চাহিদা ও সমস্যা নিয়ে সারাক্ষণ না ভেবে যারা নিজেদের চলার পথ তৈরি করে নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন, তাঁরাই সফলকাম হয়েছেন। আর যারা শুধু যেখানে-সেখানে সমস্যার বেড়াজালে আঁটকা পড়ে অনর্গল রাজা-উজির মেরে মেরে দিন কাটিয়েছেন তারা সফল হতে পেরেছেন, এমন মানুষ খুব কমই। আমার কথা হলো, আমরা যারা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কমচারি শিক্ষার কাজে নিয়োজিত তাঁদের অধিকাংশ সময় শিক্ষার কাজেই কাটানো উচিত। হাঁটে-ঘাটে-দোকানে বসে বসে বাজে আড্ডায় মেতে না থেকে একটা উত্তম শ্রেণি পাঠ তৈরি করা অনেক উপকার বয়ে আনে।
৪. শ্রেণির বাইরেও শিখণ-শেখানো চালাতে হবে: আজকাল শিক্ষার্থীরা অধিকাংশই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধাগুলো মোবাইল-টেব-রিডার-লেপটপের কল্যাণে সহজেই হাতের কাছে পেয়ে যাচ্ছে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ থেকে লেকচার শুনার আগ্রহ হারাতে বসেছে, অনেকটা। এক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে পাঠদান স্থান পাল্টানোর কথা ভাবতে হবে।  শিক্ষার্থীদেরকে কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গনে বা অন্য কোথাও অথবা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফলে, এদেরকে শিখণ-শেখানোতে আরও মনোযোগি করা য়ায় বলে আধুনিক শিক্ষাবিদগণ অভিমত ব্যক্ত করছেন।
৫. মেয়ে শিশু বা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবুন: মেয়ে শিশুদের মোটেই অবহেলা করবেন না। তাদেরকে শিখণসহ সকল কাজে ছেলে শিক্ষার্থীদের সমান অংশিদার করুন। তারা নিরুৎসাহিত হয়, ভয় পায়, বা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে এমন আচার-আচরণ বা পরিস্থিতি সৃষ্টি বিরথ থাকুন। নারীরাও এ পৃথিবীর সকল ভাল কাজ উন্নয়নের সমান অংশিদার। তাদের প্রতি সহানুভূতি শীল হোন, তাদের সমস্যাগুলোকে বড় করে না দেখে সহায়তা করুন, স্বভাবিকভাবে শিখতে, পড়তে ‍ও বেড়ে ওঠতে দিন। সমাজে-রাষ্ট্রে সর্বত্র পুরুষের সাথে মেয়েরাও পাল্লা দিতে পারে, একথা আজ সকল বিবেচনায় প্রমাণিত সত্য।
৬. কোন শিক্ষার্থীই বা শিশুই ফেল নয়, সম্পদ: পৃথিবীতে চীন ও ভারত সবচেয়ে জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশ। কিন্তু দু‘টি দেশই আজ প্রথম সারির উন্নত দেশ, সকল বিবেচনায়। প্রায়ই শোনা যায়, এলাকা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, নৃগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানরা পড়াশোনা পারদর্শি হয় না। কথাটা সত্য নয়। আমার কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় কেটেছে হাওর, পাহাড় এবং দ্বীপাঞ্চলে। বাংলাদেশের পেক্ষাপটে বলতে পারি, শিক্ষকগণ এধরণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুদের নিয়ে সদা হতাশা প্রকাশ করেন। থানচি উপজেলার ম্রু জাতির একটি শিশু যদি সেখানকার শিক্ষকদের পাঠ গ্রহণ করে বিশ্ব সেরা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠতে পারে, অন্য এলাকার শিশুরাও অবশ্যই পারবে। শুধু দরকার তাদেরকে শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহি ও সভ্য হওয়ার ওঠার প্রেরণা যোগানো। আর প্রত্যেক মানব শিশুই সম্পদ, বোঝা নয় এ বোধ তাদের মধ্যে জাগ্রত করে দেয়া।
৭. সামাজিক মর্যাদা বোধ সৃষ্টি করা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সকল শ্রেণী-পেশা-জাতি-ধর্ম-বর্ণ তথা সর্ব স্তরের মানুষের সম্পদ। এখানে, বিশেষত: সরকার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষালয়গুলোতে সকল শিশু শিক্ষার্থী পড়াশোনা করার সমান সুযোগ রয়েছে। কোন ব্যক্তি বা বিশিষ্ট পরিবারের শিশুকে বিশেষভাবে দেখার বা সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে সবা্র প্রতি সমান দৃষ্ঠিভঙ্গিতে ও অবাধে  পড়াশোনা করতে দিতে হবে। সকল শিশুর সমান সামাজিক মর্যাদা একই রকম হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এটাই কাম্য। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুরা এতে বেশ উৎসাহ পায় এবং অন্যদের পাশাপাশি তারও সুশিক্ষিত ও সুসভ্য হওয়ার পথে এগিয়ে যায়।
৮. পাঠ সমীক্ষার ধারণা প্রচলন: এ ধারণাটি জাপানে প্রথম প্রচলন করা হলেও, সকল দেশে পাঠ সমীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সকল উপজেলায় এ বিষয়ে শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। অন্তত: প্রধান শিক্ষকগণ এটি গ্রহণ করেছেন। পাঠ সমীক্ষা বা লেসন-স্টাডি হলো; এমন এক পাঠদান পদ্ধতি যাতে সহকর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতায় প্রতি মাসে একজন শিক্ষক একটি ভাল পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করে শ্রেণি পাঠদান করা। সাধারণত: গণিত এবং বিজ্ঞান বিষয়ের জটিল এবং দুর্বোধ্য পাঠ্য বিষয়বস্তুগুলোর শিখণ ফল অর্জন করানোর জন্য পাঠ সমীক্ষা পদ্ধতি বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত। একজন শিক্ষক মাসের শুরুতে পাঠ-সমীক্ষার আলোকে শ্রেণি পাঠদানের একটি খসড়া পাঠ পরিকল্পনা সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব করবেন। সহকর্মীগণ তাঁকে পাঠ পরিকল্পনাটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার জন্য বিবিধ পরামর্শ প্রদান করবেন এবসংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রাপ্ত পরামর্শগুলো তাঁর পরিকল্পনায় সমন্বয় করে নিবেন। তিনি সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে তা পুণরায় উপস্থাপন করবেন। মাসের শেষের দিকে সে পাঠ-পরিকল্পনার আলোকে শিক্ষার্থীদেরকে সরাসরি শ্রেণিতে উপস্থাপন করবেন। আর তাঁর শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সহ সহকর্মী শিক্ষকগণ তাতে উপস্থিত থেকে পর্যবেক্ষন করবেন। এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে, প্রতিটি বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার আবহই বদলে যাবে। সারাবিশ্বে এটি একটি অত্যাধুনিক শ্রেণি পাঠদান পদ্ধতি হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে।
৯. পিছিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেয়ার কৌশল অবলম্বন: এটিও জাপানী উদ্ভাবন। শিক্ষাদানের নতুন কৌশল। শ্রেণিতে সকল শিক্ষার্থী পড়াশোনায় সমান পারদর্শি হবে বা সবাই শিক্ষক কতৃক পাঠ উপস্থাপনের পর অনেক শিক্ষার্থী শিখণ ফল বা যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। সাধারণত: এধরণের শিক্ষার্থীদেরকে সে সব শিখণ ফল বা যোগ্যতা পূণরায় অর্জন করারনোর জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। আর শিখণ ফল বা পাঠের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ এসব শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষকদের নিবীড তত্ত্বাধানে রেখে অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিখণ ফল বা যোগ্যতাসমূহ অর্জন করানোই হলো ইতিবাচক লড়াই চালানোর বিশেষ পাঠদান পদ্ধতি। এ পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর একটি শিখন প্রচেষ্টা।
১০. বিদ্যালয়ের গন্ডির বাইরের বিকল্প শিখণ: এমন কিছু কিছু শিক্ষার্থী পাওয়া যায় যে, তারা স্কুলে বা প্রাতিষ্ঠানিক শিখণ-শেখানোর পরিমন্ডলে শিখণে ব্যর্থ হয়, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদেরকে পারদর্শি করে তোলা যায়। এসব শিক্ষার্থীদেরকে কম্পিউটার বা মাল্টিমিডিয়ার সামনে হাজির করে এবং তাদেরকে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া তাদের শিখন ফলপ্রসূ হয়। শিখণ-শেখানোর সনাতনী অনেক কলা-কৌশল প্রযোগের পরও যে সব শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অর্জিত হয় না, তাদেরকে পড়াশোনায় পারদর্শি করার জন্য এ পদ্ধতিটি কাজে লাগানো যেতে পারে।
১১. সমস্যা ভিত্তিক শিখণ: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরকে কোন একটি সমস্যা সমাধান করতে দিয়ে শেখানোর এ কৌশলটি অস্ট্রেলিয়ায় বেশ জনপ্রিয়। বাস্তব জীবনের কোন একটি সমস্যা শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীকে একযোগে সমাধান করার দায়িত্ব দেয়া হলে সবাই মিলে তা সমাধানের মাধ্যমে তাদের শিখন ফল অর্জন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। শিক্ষকের চেয়ে এখানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকাই মুখ্য থাকে।
১২. প্রযুক্তির সহায়তায় শিখন: কম্পিউটার, প্রজেক্টর, স্ক্রিন এবং অন্যান্য শিখণ-শেখানো প্রযুক্তিগত উপকরণ শিক্ষার্থীদের জন্য উম্মুক্ত করে দিয়ে শিখন বিষয়বস্তু এবং পাঠের কাংখিত শিখন ফল বা যোগ্যতা অর্জনের দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের কাজ তাদেরকে করতে দেয়ার মাধ্যমে এ ধরণে শিখণ-শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এ পদ্ধতিটিও অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োগ করে বেশ সাফল্য পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে ধীরে ধীরে পদ্ধতিটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
১৩. কাঠামোবদ্ধ শিখন পদ্ধতি: শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধারণাজাত পদ্ধতিতে পাঠের শিখন ফল আয়ত্ত্ব করার প্রচেষ্টা এটি। তাদের নিজেদের অনুসৃত এবং নিজেদেরই উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে, এমন একটি শিখন-শেখানো কৌশল এটি। প্রাচীন গ্রীসে এটি অনুসরণ করা হতো। সাধারণত: এ ধরণের পদ্ধতি বর্তমানে তেমন একটা কার্যকর না থাকলেও, ক্ষেত্র বিশেষে এটা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
১৪.আন্তর্জাতিক শিখণ ফল: অনেক দেশে আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলোকে শিখণ-শেখানোর পাঠ্য বিষয়বস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে শিখন ফল অর্জন করানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে। সাধারণত: কানাডাসহ বেশকটি দেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষাথীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এ পাঠদান পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে।
১৫. উন্মুক্ত পদ্ধতির শিখণ: বাংলাদেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সারা পৃথিবীতে সকল স্তরের পড়াশোনায় অন-লাইনে উন্মুক্ত পদ্ধতি শিখণ-শেখানো চালু করা হয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরণের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যারা নিয়মিত গমনাগমন করতে ও পড়াশোনা চালিয়ে যেত পারে না, তাদের জন্য এটা চালু করা যেতে পারে।
১৬.যোগ্যতা ভিত্তিক শিখণ: মার্কিন শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুম পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। শিক্ষার্থীরা জানা বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন বা নিজেদের প্রয়োজনে বিশেষ কোন বিষয়ে বা ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করার প্রচেষ্টা এটি। এখানে সময়-সীমা নির্ধারিত থাকে না। নির্ধারিত যোগ্যতাসমূহ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রচেষ্টা চলে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এ পদ্ধতিটি অনুসৃত হচ্ছে। পাঠ্যবইগুলো যোগ্যতা  ভিত্তিক পদ্ধতিতে রচনা ও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথম হতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ২৯ টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করার কথা নির্ধারণ করা আছে। আবার শ্রেণি ভিত্তিক ও বিষয় ভিত্তিক যোগ্যতা এবং শিখনফলসমূহও নির্ধারণ করা আছে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা বয়স, সামর্থ্য এবং ধারণ ক্ষমতা ব্যবহার করে ৫ বছরে ধাপে ধাপে প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রণীত শিক্ষাক্রমের আলোকে যোগ্যতাসমূহ অর্জন করছে।
১৭. ব্লগোনা প্রসেস: ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে এ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। উচ্চ শিক্ষা স্তরে পদ্ধতিটি প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সরকারি কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং ছাত্র/ছাত্রী, সংশ্লিষ্ট অংশিজন, কর্মচারি, আন্তার্জাতিক সংস্থাসমূহ যৌথভাবে এ ধরণে পদ্ধতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকেন। ইউরোপীয় দেশগুলোর ছাত্র/ছাত্রীরা অন্য দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পড়াশোনা করে থাকে। অর্থাৎ পারস্পরিক শিক্ষার্থী বিনিময়ের মাধ্যমে মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণকল্পে এ শিক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে শিক্ষা ও শিক্ষার্থী বিনিময়ের ব্লগোনা প্রসেস পদ্ধতি মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ও কার্যকর কৌশল।

১৮. কর্মমুখি শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করানোর কৌশল: শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষা গ্রহণ শেষে বিশে দক্ষতা নিয়ে কর্মে প্রবেশ করতে পারে সে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অজৃন করানোর বিশেষ কৌশল এটি। শিক্ষারত অবস্থায় সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ কারিগরি দক্ষতা অর্জন করানোর মাধ্যমে এ কৌশলটি অবলম্বন করা হয়। শিক্ষা সমাপনের সাথে সাথে শিক্ষার্থীরা এতে কোন একটি চাকুরি খুঁজে পায়।
১৯. হার্বার্ট স্টেইন্স নী ল: হার্বার্ট স্টেইন্স ছিলেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। তাঁর শিক্ষাদান  পদ্ধতিটি হার্বার্ট স্টেইন্স নী ল হিসেবে পরিচিত। তাঁর ল-তে বলা হয়েফে,“ কোন কিছু যাদি চিরস্থায়ী না হয়, তবে তা স্তব্ধ হয়ে যায়।” শিক্ষা ক্ষেত্রের ভেতরের ও বাইরের অনেকেই এটাকে শিক্ষাগ্রহণকারি এবং শিক্ষাদাতাগণের জন্য জাগরণী বাণীর মত। এ পদ্ধতি যে কোন শিক্ষা পরিবেশে সক্রিয়ভাবে পরিবর্তন বয়ে আনে এবং অনুসরণীয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
২০. অন-লাইন পদ্ধতি শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারি: অনেকে মনে করেন অন-লাইন শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া সনাতনী শিক্ষা গ্রহণ পদ্ধতির দার উন্মোচন করে দিয়ে এটাকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। আবার অনেকে মানে করেন এতে শিক্ষার মান অর্জনকে ব্যাহত করছে। মার্কিনীরা এটাকে সংকট হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের ধারণা একারণে বেকারত্ব সৃষ্টি করছে এবং তারা চীন এবং ভারতের চ্যালেঞ্জের সন্মুখিন হচ্ছে। এর বিকল্প হিসেবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এমন সব উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ করা।
২১.উন্মুক্ত উদ্ভাবন: এটি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। ব্যবসায় ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে কোম্পানীর জন্য নতুন নতুন ব্যবসায় ক্ষেত্র উন্মোচন করে দেয়। উচ্চ শিক্ষা স্তরে এ কৌশলটির প্রয়োগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত শিখণ-শেখানো ভাবধারাকে এক সো্রতে নিয়ে আসে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষেত্রে আবদ্ধ না থেকে নতুন দিগন্ত খোলে দেয়।
২২.উঁচু মানের শিক্ষক: উঁচু মানের শিক্ষক পেতে হলে, উপযুক্ত বেতন-ভাতা দিতে হবে তাঁদেরকে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ এটি। উচ্চ মানের শিক্ষক সৃষ্টি করার প্রয়াস চালানোর চেয়ে শিক্ষকতা পেশার প্রতি গুরুত্ব দেয়াই হবে উত্তম। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাবিদ পাসি শেলবার্গ মনে করেন যে, শিক্ষকদেরকে অধিক হারে বেতন-ভাতা প্রদান করতে হবে এবং তা যৌক্তিক। ফিনল্যান্ডে শিক্ষা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করা আইন বিষয়ে অথবা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রী অর্জন করার চেয়ে অধিক কঠিন। অর্থাৎ মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষার জন্য শিক্ষকদেরকে উপযুক্ত মর্যাদা দিতে হবে।
২৩.ফিনল্যান্ডের শিক্ষা পদ্ধতি: ফিনল্যান্ডে মানসম্মত শিক।ষা নিশ্চিতকরণ এবং শীর্ষস্থান দখল করার কৌশলের চেয়ে প্রত্যেককে মানসম্মত শিক্ষাদানের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অন্য অনেক দেশের মত ফিনল্যান্ড প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে না, অথবা এমন কি পঞ্চম শ্রেণি পাশ না করলে কোন গ্রেড দেয়া হয় না। তারা কঠোর কোন পদক্ষেপ গ্রহনেও বিশ্বাস করে না, তারা বরং আস্থা এবং সমাতা অর্জনকে উৎসাহিত করে।
২৪. সামাজিক সহায়তা প্রদান কৌশল: নারী শিক্ষাকে সাংগঠনিক এবং সামাজিক সংগঠনসমূহের মাধ্যমে উৎসাহ যোগাতে হবে। এত তারা আত্নবিশ্বাস অর্জন করে এবং অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহসিকতার অধিকারি হয়। এতে নারী জীবন সফল হয়।
২৫. চেঞ্জ এজেন্টস: শিক্ষকগণই পারেন শিক্ষায় পরিবর্তন এবং গুণগত মান বৃদ্ধি করতে। তারাই পারেন একটি জাতিকে উন্নয়নের পথ দেখাতে। তাঁরা চাইলেই শিক্ষায় সব কিছু করা সম্ভব, অন্য কেহ নয়। কোন পদ্ধতি বা কৌশলই শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে করে না। তাঁরা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। যে কোন পরিস্থিতিতে বা সীমাবদ্ধতাই থাক না কেন, তাঁরা শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাদান করে যান। তারাই চেঞ্জ এজেন্ট।
২৬.কমন কোর চেঞ্জ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কে-১২ নামে শিক্ষা স্তরে কমন কোর পদ্ধতি অনুসৃত হয়ে থাকে। ভাষা শিখণ ও গণিত বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করানোর উপর এখানে গুরুত্বারোপ হয়ে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর উপযোগি শিখণ-শেখানো এবং শিক্ষার্থীদেরকে উপযোগি করে তোলার জন্য দেশটি এ ধরণের পদ্ধতি প্রচলন ঘটিয়েছে। শিশু শ্রেণি হতে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর পর্যন্ত এ শিক্ষা স্তর। অন্য অনেক দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনৃসৃত কে-১২ শিক্ষা স্তর এবং ভাষা ও গণিত শিখনের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষা প্রদানের এ কৌশলটি অবলম্বন করা হলে দেশে-বিদেশে একবিংশ শতাব্দীর শিখণ-শেখানোর মান অনেক বৃদ্ধি পাবে।
২৭.স্টার্ট-আপ এডুকেশন: ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাগারবার্গ দম্পতি শিক্ষার প্রসার এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ পদ্ধতি চালু করে। ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ফেসবুকের অনুসরণে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ সংস্থা এবং সংগঠনগুলোও এ ধরণের উদ্যোগ চালু করতে পারে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচিতে দারুণভাবে উৎসাহিত হচ্ছে এবং পেরণা পাচ্ছে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয় পক্ষ এ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং উন্নয়নে অবদান রাখছে।
২৮. মোবাইল শিখণ-শেখানো: মোবাইল ফোন ব্যবহার মানব জীবন-যাত্রায় বিশাল ও ব্যাপক পরিবর্তন এবং প্রভাব বয়ে এনেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর শিখণ-শেখানোতেও দারুন অবদান রাখছে মোবাইল ব্যবহার। সর্বস্তরের মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে কল্প জগত বা বিনোদন জগত পুরোটাই মোহাবিষ্ঠ হয়ে আছে। শিক্ষা জগতও এর বাইরে নয়। এ মোবাইল ব্যবহার হচ্ছে; ভ্রমণ, কথা বলা, পড়াশোনা, বিনোদন, সবখানে। একটি মোবাইল অথবা লেপটপই বদলে দিতে পারে শিক্ষা জগতকে। মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
২৯. অদৃশ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: দুনিয়াটাই শিক্ষা জগত। কোন শিক্ষার্থী চাইলেই শিখতে পারে যে কোন অবস্থায়। তাহলে কোন শিক্ষার্থীকে বাক্সবন্ধী করে রাখার কীই বা অছে? শুধু অন-লাইনে নয়, এ যুগের শিক্ষার্থীরা শিখবে, সবখানে। তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে আঁটকে রাখার দরকার নেই। তারা শিখুক যেখানে ইচ্ছা।
৩০. আর্থিক স্বাবলম্বিতা: শিক্ষার্থীদেরকে আয় বর্ধক কাজে লাগিয়ে শিখণে মনোযোগি করা যেতে পারে। আর্থিকভাবে দুর্বল শিশুদেরকে বিবিধ আয়-উপার্জনমূলক কাজে নিয়োজিত করে উপার্জিত অর্থ তাদের কল্যাণেই ব্যবহার করার কৌশল অবলম্বন করে মানসম্মত শিক্ষা এবং ব্যাপক শিক্ষার প্রসার ঘটানো সম্ভব। সেইসাথে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখিও হয়ে ওঠে।
৩১. ভোকাশনাল প্রশিক্ষণ: দেশে দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ডিগ্রী নিয়ে কর্মমুখি সনদ পাওয়ার জন্য আবার অন্য শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হয় বা সনদ যোগাড় করার চেষ্টা করে। একটি চাকুরি পাওয়ার জন্যই তারা তা করে থাকে। কিন্তু কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তা করতে হয় না। বিশ্বব্যাপী এ ধরণের শিক্ষা বেশ সফল ও জনপ্রিয়। ছিন্নমূল, শ্রমজীবী, বাস্তুহারা, দরিদ্র প্রভৃতি শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা অনেক বেশি কার্যকর।
৩২.গেমিফিকেশন বা খেলার মাধ্যমে শিখণ: জনৈক ইংরেজ শিক্ষাবিদ শিখণ-শেখানোতে খেলা-ধুলা সংযোজন করার কৌশলটি উদ্ভাবন করেন। সাধারণত: শিক্ষা গ্রহণে খেলার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে চাইবেন না। কিন্তু শিখনে এমন কিছু কিছু বিষয় আছে, যাতে খেলার সমন্বয় ধারুণ উপকারিতা বয়ে আনে।
৩৩. স্মার্ট ক্যাপিটাল পদ্ধতি: সঠিক কাজে সঠিক অর্থ বিনিয়োগ করে শিখন-শেখানোর কৌশল এটি। অর্থাৎ পড়াশোনা করার প্রয়োজনে কেউ যদি মোবাইল, লেপটপ, কম্পিউটার বা অনুরূপ কিছু কিনে নেয় বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তবে তা ব্যর্থ হয় না। এসব প্রযুক্তি কিনে শেখার কাজে  ব্যবহার করলে, সেটা কোন দিনই বিফলে যায় না। তাই স্মার্ট ক্যাপিটাল কৌশল অবলম্বন হতে পার একবিংশ শতকের শিখন-শেখানোর অনণ্য পদ্ধতি।
৩৪. ক্যাটালিটিক রোল: মাইক্রোসফটের জনক বিল গেট্স এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মত সংস্থাগুলো আধুনিক সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তার এবং প্রসারে দারুণ ভূমিকা রাখছে। এধরণের দাতব্য সংস্থাগুলো শিক্ষার্থীদেরকে আর্থিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রন্তিক-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অত্যাধনিক শিক্ষা অর্জনে সফল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পাশাপাশি তরুণ প্রযুক্তিবিদ এবং তথ্য=প্রযুক্তি খাতে বিল গেটসেদের অবদান অবিস্মরণীয় রেখে বিশ্বব্যাপী সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ শিক্ষা জগতকে আরও আলোকিত করে তুলতে পারেন।
৩৫. ব্লেন্ডেড লার্ণিং: শিখণ-শেখানোতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয় পক্ষ মুখোমুখি উপস্থিত থাকেন এবং শিক্ষক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সাথে প্রয়োজনীয় সকল শিখণ সামগ্রী এবং উপকরণাদি থাকে। কোন প্রযুক্তির সহায়তায় আবার কোন সময় পাঠ উপস্থাপন চলে। এখানে মূলত কোনটার বিশেষ প্রাধান্য থাকে না। শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে নির্দেশনা দেন মাত্র। আর শিক্ষিঅর্থীরা শিখে নেয়।
৩৬. কালেক্টিভ এডুকেশন বা সামষ্টিক শিখণ: এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা দলীয়ভাবে শিখে। একাকী শিখনের চেয়ে শিক্ষার্থীরা একে অপরের থেকে শিখে এবং অধিকতর কার্যকরভাবে শিখে এ পদ্ধতিতে। এটা এমন নয় যে, একাকী শিখে নেন তেমন কোন শিক্ষার্থীকে অেবহেলা করা হয়, এটা বরং একই বিয়বস্তু সংঘবদ্ধভাবে শিখলে সকলের শিখনটা ভালভাবে হয়। কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে এক অপরের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা পাঠের শিখনফল অর্জন করে নেয়।
৩৭. পার্সোনালাইজড এডুকেশন বা ব্যক্তিগত শিক্ষা: শিখনকে শিক্ষার্থী ব্যাক্তিগতভাবে গ্রহন শিখে নেয়। এটা বেশ কার্যকর একটা পদ্ধতি। এতে ব্যক্তিগত শিখণে সামষ্টিক শিখন অবহেলিত থাকেনা। এত শুধু ব্যক্তি চাহিদা এবং আকাংখা পূরণ হয়ে যায়। অর্থাৎ অনেকের মধ্যে থেকেও একক শিখন অর্জিত হয়ে যায়।
৩৭. নমনীয় শিখণ: শিক্ষার্থী যা শিখতে চায়, তা করতে দেয়া হলো নমনীয় শিখন। ব্যক্তিগত শিখনের সাথে নমনীয় শিখণকে পরিচিত করে তোলা যায়। কোন বিশেষ বিষয় শিক্ষার্থী পছন্দানুযায়ি, স্বেচ্ছায় এবং নিজস্ব উপায়ে শিখণেল প্রক্রিয়া বিশেষ এটি। একটা মান বজায় রেখে আমরা ব্যাক্তি বিশেষ হিসেবে শিখন-শেখানো হওয়া উচিত নমনীয় প্রক্রিয়ায়।
৩৯. ফ্লিপ্ড লার্ণিং বা শিখনকে মুখ্য করে তোলা: একটি শ্রেণিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কোন নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ না থেকে শিখণ অর্জনই প্রাধাণ্য পাবে এতে। শিক্ষক কী করছেন বা শিক্ষার্থীরাই কী করছে এমন অবস্থার মধ্যে শিখণ ফল অর্জিত হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া এটি। এটা হতে পারে কোন ভিডিও প্রদর্শণ বা কোন প্রবন্ধ আলোচনাকে কেন্দ্র করে। শিখণ-শেখানোর শেষটা ঘটে শিখণ ফল অর্জন ক্রিয়ার সফল সমাপ্তির মাধ্যমে।
৪০. ক্লাসিক্যাল এডুকেশন: এটা এমন এক মনোমুগ্ধকর শিখণ-শেখানো পদ্ধতি যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এমন কোন সিরিয়াস বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন যে, শিক্ষার্থীরা ক্ষণকালের জন্য যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। হতে পারে তা শেক্শপিয়ার বা রবীন্ত্র নাথের কোন উচ্চমার্গীয় সাহিত্য পাঠ। পাঠটি শিক্ষার্থীদেরকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় তারা তার রস আস্বাধন করছে, কিন্তু তা দেখতে বা বুঝতে পারছেনা। কিন্তু আনন্দ উপভোগ করছে এবং অনুধাবন করে যেতে পারছে, শিক্ষার্থীরা। ছোট্ট পরিসরে বা কম সংখ্যক শিক্ষার্থী বিশিষ্ট শ্রেণি কক্ষে।
৪১. মাধ্যমিক শিক্ষা উত্তর মুক্ত শিখণ: বিশ্বের অনেক দেশে মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকে তারা পরবর্তী স্তরে পড়াশোনা করবে কি করবে না, তা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এ স্তরে তারা কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যায় অথবা শুধুই পড়াশোনা করে। কিন্তু তাদেরকে উন্মুক্ত করে দেয়া হলে তাদের সুবিধা অনুযায়ি তারা এগিয়ে যায়।
৪২. ধর্মীয় শিক্ষা: ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে, কারণ সম্পদায় ও সংস্কৃতি বিশেষ অন্য বিষয়ে জ্ঞানার্জনের বাইরে এটাকে তারা গুরুত্ব দেয়। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি তাদের পারিবারিক এবং সম্প্রদায়গত সভ্যতাকে ধারণ করে নিতে আগ্রহী এবং পরিবর্তমান বিশ্বের অসহিঞ্ষুতা ও সহিংসতা তাদেরকে আবর্তিত করে।  ফলে ধর্মীয় শিখণ বিষয়ও শিক্ষার এটি পদ্ধতি হতে পারে।
৪৩. নৈতিক শিক্ষা: মানুষের আন্ত:কর্মে নৈতিক শিক্ষা অনেক ধর্মীয় এবং অনেক আধ্যাত্নিক ভাবনা-চিন্তাকে ধারণ করে। তাই তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশমান ধারাকে আত্ত্বস্থ করে আমরা পূর্বসূরিদের ভুল-শুদ্ধগুলোকে বেছে নেব এটাই আসল কথা। নৈতিক শিক্ষা এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়ক হয়।
৪৪. চারিত্রিক শিক্ষা: নৈতিকতা সৃষ্টির পরিমন্ডলে চারিত্রিক শিক্ষার কথা আসে দ্বিতীয় স্তরে। চরিত্র এমন কি শিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতার চেয়ে শক্তিশালী। শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহিংসতা এবং  যৌনতার প্রতি এত দ্রুত আসক্তি বন্ধে চারিত্রিক উন্নয়ন কার্যকর ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বয়ে আনতে পারে। সকল স্তরের শিক্ষার্থীদেরকে চারিত্রিক শিক্ষা প্রদান হতে পারে অন্যতম কৌশল।
৪৫. রেডিনেস টেস্টিং: এ পদ্ধতি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদেরকে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালত করতে পারে। এটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সিদ্ধান্ত সহায়তা করে যে, শিক্ষার্থীরা একটি বিশেষ স্তরের বিবিধ কাজ সম্পাদন করতে পারবে কিনা, অত:পর শিক্ষার্থীদের আধ্যাত্নিকতা তাদেরকে কোথায় এবং কোন দিকে এগুতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয়।
৪৬. শেয়ারিং ভয়েসেস: নিউজিল্যান্ডে শিক্ষার্থীদেরকে অন-লাইন ব্যবহার করে তাদের গল্প বলতে এবং কন্টস্বর প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়া হয়। তাদের নিজ সম্প্রদায় এবং তাদের দেশে। মুলত শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেয় এবং নিজেদের শিখণের দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়।
৪৭. দু:সাহসিক ভ্রমণের মাধ্যমে শিখণ: শিক্ষার্থীদেরকে পর্বতারোহণ বা সমুদ্র ভ্রমণের অবাধ সুযোগ দেয়া হলে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক কিছু শেখার সুযোগ পায়, যা হয়ত শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ্ থাকলে সম্ভব হত না। এতে তাদের মনোবল ও বেঁচে থাকার শিক্ষা লাভ হয়।
৪৮. গ্লোবাল ভিউ: চীনের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ইয়ং ঝোহা বর্তমানে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে  শিখণ-শেখানোতে খুব সাফল্য আসে না। শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল হতে, উদ্যোক্তা হতে শেকানো সম্ভব হলে, তারা বিশ্ব কর্মী হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে বৈশ্বিকমন্ডলে উপযোগি মানব সম্পদ গড়ে তোলার কথা ভাবতে হবে। এতে তারাই ভাগ্য গড়ে নেবে, শিক্ষা তা করে দেবে না।
উপসংহার: বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তথ্য-প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ব্যবহার এবং বিকাশ; শিক্ষার ধারণা এবং শিখণ-শেখানোর গতি-প্রকৃতিকে পুরোপুরি বদলে দেয়ার দারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। আগামীতে তা মানব জাতির শিক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিকে কোন পথে ধাবিত করবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শিক্ষার্থীদেরকে বই বিমুখ এবং সিরিয়াস শিক্ষা গ্রহণ ও পঠন-পাঠন হতে বিচ্যুত হতে দেখলেই বুঝা যায়, সনাতন শিক্ষা এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি আর কাজে আসছে না। আমরা অন্য কিছুতে তা খুঁজছি। এমনই কিছু শিখণ-শেখানো পদ্ধতি এ নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
*সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার, মহেশখালী, কক্সবাজার।